চট্টগ্রাম/‘১০০ পুলিশ থাকলেও গুলি করে মারব’, চিকিৎসককে চাঁদার জন্য হুমকি

রোগীর সিরিয়াল নেওয়ার জন্য ব্যবহৃত সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসকদের মুঠোফোন নম্বর সাধারণত নিরাময়ের বার্তা বয়ে আনে। কিন্তু চট্টগ্রামের হাটহাজারীর চিকনদণ্ডী ইউনিয়নের বাসিন্দা এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের আমান বাজারের চিকিৎসক এম ওয়াই এফ পারভেজের ক্ষেত্রে সেই ফোনই হয়ে উঠেছিল আতঙ্কের কারণ। বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে ‘বড় সাজ্জাদ’ এবং তার সহযোগী মো. রায়হানের পরিচয়ে হোয়াটসঅ্যাপে একের পর এক আসা প্রাণনাশের হুমকি বদলে দেয় তার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ১০টা ৫৪ মিনিটে। প্রতিদিনের মতো সেদিনও রোগীদের ভিড় সামলাচ্ছিলেন ডা. পারভেজ। এমন সময় রোগীদের সিরিয়াল লেখার জন্য ব্যবহৃত ফোনে একটি বিদেশি নম্বর থেকে কল আসে। ফোনটি রিসিভ করেন তার সহকারী হ্যাপি বড়ুয়া। ওপাশ থেকে এক ব্যক্তি গম্ভীর স্বরে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে চান। সহকারী মুঠোফোনটি পারভেজের হাতে তুলে দেওয়ার পরপরই শুরু হয় মনস্তাত্ত্বিক চাপ।
মুঠোফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তি নিজেকে ‘বড় সাজ্জাদ’ পরিচয় দিয়ে সরাসরি হুমকি দেন—২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১০ লাখ টাকা প্রস্তুত রাখতে হবে, নইলে যেকোনো সময় চেম্বারে এসে তাকে মেরে ফেলা হবে। এমন হুমকির পরদিন, ৩ সেপ্টেম্বর হাটহাজারী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন চিকিৎসক।
জিডি করার পর হুমকির মাত্রা কমার বদলে আরও বেড়ে যায়। এবার সাজ্জাদের সহযোগী মো. রায়হানের পরিচয়ে হোয়াটসঅ্যাপে লিখিত ও ভয়েস মেসেজ আসতে থাকে। একটি বার্তায় বলা হয়, টাকা না পাঠালে অনেক বড় বিপদ হয়ে যাবে। তোমার পেছনে আমাদের লোক লাগানো আছে। তোমার গাড়ির নম্বরও আছে। ১০০ জন পুলিশ থাকলেও তোমাকে গুলি করে মেরে ফেলব। রোগী সেজে তোমাকে মেরে ফেলা হবে, চেম্বারে গিয়ে।
চিকিৎসকের সব তথ্যই তাদের জানা—এমন দাবি করে তাকে হুমকি দেন কথিত চাঁদাবাজরা। তাকে পাঠানো একটি বার্তায় বলা হয়, আপনি কোথায় জায়গা নিয়েছেন, না নিয়েছেন, সবকিছু আমরা জানি। আপনি কত টাকার মালিক, সেটাও আমরা জানি। আমরা গরিব মানুষের পেটে লাথি মারি না। ভাইয়া বলছে ১০ লাখ টাকা দিতে। আপনাকে ২৪ ঘণ্টা সময় দেওয়া হলো। রাগ করার কোনো প্রয়োজন নাই। মনে করেন, আপনার একটা বিপদ আসছে।
ভয় দেখানোর পাশাপাশি একধরনের মনস্তাত্ত্বিক কৌশলও নেয় চাঁদাবাজরা। হোয়াটসঅ্যাপের কিছু বার্তায় ‘পরামর্শের’ সুরে বলা হয়, আপনি অনেক মানুষের জীবন বাঁচান, এজন্য কথাটা বলতেছি। আপনি ৮ লাখ দিয়েন। জীবনে বেঁচে থাকলে অনেক টাকা কামাতে পারবেন। একটা সমাধান করে ফেললে ভালো হবে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে টাকাটা দিয়ে দিয়েন।
কিন্তু চিকিৎসক চাঁদা না দেওয়ায় নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর বাড়তে থাকে চাঁদাবাজদের ক্ষোভ। একপর্যায়ে আগের দাবির টাকার অঙ্ক দ্বিগুণ করে বলা হয়, আমি রায়হান কে, তুমি চিনো না। বেয়াদবি করতেছ। ১০ লাখ টাকার বদলে ২০ লাখ টাকা দিতে হবে।
ঘটনাটি ঘিরে জেলা পুলিশ প্রশাসনে চাঞ্চল্য তৈরি হয়। চিকিৎসকের অভিযোগের ভিত্তিতে ছায়াতদন্তে নামে পুলিশ। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলমের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে নগরের বিভিন্ন স্থান থেকে আটক করা হয় এই চক্রের সাত সদস্যকে।
আটকরা হলেন—কামরুল হাসান ওরফে সাগর (২৫), মো. রিকু (২৫), মো. তরিকুল ইসলাম ওরফে রোহিত (২০), আহমদুল্লাহ ওরফে মাসুম মেম্বর (৪০), আহমদ রেজা শাকিল (২৫), মো. মানিক (৪০) ও নুরুল আলম। তারা সবাই বিদেশে অবস্থানরত বড় সাজ্জাদ ও ডেভিড ইমনের নাম ভাঙিয়ে বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে এই চাঁদাবাজি চালাচ্ছিলেন।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম এশিয়া পোস্টকে বলেন, চিকিৎসকের অভিযোগ পেয়ে পুলিশ তদন্তে নামে। কারাগারে থাকা ডেভিড ইমন ও কালা মোবারকের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে এই চক্রের সাত সদস্যকে আটক করা হয়। তারা বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে সাজ্জাদ, রায়হান, ডেভিড ইমনদের নাম ব্যবহার করে চাঁদা আদায় করে।
ঘটনায় জড়িত চক্রের সদস্যরা পুলিশের জালে ধরা পড়ায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও স্থানীয় চিকিৎসা অঙ্গনে। তবে শঙ্কা পুরোপুরি কাটেনি।
চিকিৎসক এম ওয়াই এফ পারভেজ বলেন, প্রতিদিন আমার কাছে অনেক রোগী আসেন। আবার অনেককে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন জায়গায় আমাকে যেতে হয়। সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ ও তার সহযোগীর পরিচয়ে ফোন করে চাঁদা চাওয়ার পর থেকে চরম আতঙ্কে ছিলাম। পুলিশ চক্রের কয়েকজনকে আটক করায় কিছুটা স্বস্তিতে আছি। কিন্তু সন্ত্রাসীদের মূল নির্দেশদাতাকে গ্রেপ্তার করতে হবে। আর যারা আটক হয়েছেন, তারা যাতে সহজে আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে আসতে না পারেন, তা নিশ্চিত করা জরুরি।


