logo

দুই বছর ধরে বন্ধ সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং, হাতছাড়া ১৬০০ কোটি টাকা

দুই বছর ধরে বন্ধ সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং, হাতছাড়া ১৬০০ কোটি টাকা

বছর দুয়েক আগে সৌদি আরব থেকে আমদানি করা ক্রুড অয়েল দিয়ে কয়েক দফা কমিশনিং সম্পন্ন হয় সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিংয়ের (এসপিএম)। তবে এটি পরিচালনার জন্য অপারেটর নিয়োগে জটিলতা দেখা হয়। এতে দুই বছর ধরে অচল হয়ে পড়ে আছে ৮ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত প্রকল্পটি। অথচ কক্সবাজারের মহেশখালীতে নির্মিত এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল সংকটকালে সহায়তা হিসেবে জ্বালানির মজুত রাখা।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে প্রচলিত পদ্ধতিতে যেখানে এক লাখ টন তেল খালাস করতে সময় লাগে অন্তত ১১ দিন, সেখানে এসপিএম প্রকল্পটি চালু থাকলে তা সম্ভব হতো মাত্র ৪৮ ঘণ্টায়। এতে সরকারের সাশ্রয় হতো বছরে ৮০০ কোটি টাকা। আর দুই বছর বন্ধ থাকায় হাতছাড়া হয়েছে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।

অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের কারণে দেশে জ্বালানি সংকটের এই অস্থির সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত এই অত্যাধুনিক এই জ্বালানি ব্যবস্থাপনা। প্রকল্পটি বন্ধ থাকায় এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বাংলাদেশ।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুই বছর আগে মহেশখালীর উপজেলার কালারমারছড়া ইউনিয়নের সোনারপাড়া গ্রামের ১০০ একর জমিতে প্রকল্পটির অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হয়। বর্তমানে সেখানে খালি পড়ে আছে ছয়টি স্টোরেজ ট্যাংকসহ অবকাঠামো। এসব স্থাপনার পশ্চিমের বঙ্গোপসাগরে বসানো হয়েছে ভাসমান মুরিং।

ইআরএল কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, সর্বশেষ এই প্রকল্পের পাইপলাইনে জমে থাকা পাঁচ হাজার টন এবং অপরিশোধিত তেলের চারটি ট্যাংকের ডেড স্টক (মজুত ট্যাংকের তলানিতে জমে থাকা অপরিশোধিত তেল) তুলেও পরিশোধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছিল।

অপারেটর নিয়োগে জটিলতা

প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, বাংলাদেশ ও চীন সরকারের মধ্যে (জি টু জি ভিত্তিতে) বাস্তবায়িত প্রকল্পটির অপারেটর নিয়োগ জটিলতায় কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ইআরএলের বিশেষ আইন বাতিলের পর উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হয়।

কর্মকর্তারা জানান, আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে বাকি কাজ শেষ করে প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

এ ব্যাপারে পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানির প্ল্যানিং অ্যান্ড অপারেশন বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) জামান নাহিদ রায়হান বলেন, ‘মূলত অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স (ওঅ্যান্ডএম) কন্ট্রাক্টর নিয়োগ সম্পন্ন না হওয়ায় প্রকল্পটি এখনো চালু হয়নি। এ-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, “সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) অনুসারে টেন্ডার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রথম দফার টেন্ডার ‘রেসপনসিভ’ না হওয়ায় পুনরায় রি-টেন্ডার আহ্বান করা হয়। বর্তমানে দরপত্র মূল্যায়ন পর্যায়ে রয়েছে। মূল্যায়ন শেষে সর্বনিম্ন দরদাতা নির্বাচিত হলে দ্রুতই প্রকল্পটি চালু করা সম্ভব হবে।”

ডিজিএম বলেন, “কয়েক দফা কমিশনিং সম্পন্ন হলেও প্রকল্পের কিছু অপারেশনাল এবং ফাংশনাল টেস্টের কাজ চলমান রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ‘ওয়ারেন্টি’ বা ‘ডিফেক্ট লাইবিলিটি পিরিয়ড’ ফেব্রুয়ারিতে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় তা আরও ছয় মাস বাড়ানো হয়েছে।”

‘এসপিএম বয়া এলাকায় মাদার ভেসেল নোঙরের সময় নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে টাগবোটসহ প্রয়োজনীয় সহায়ক জাহাজ ব্যবহার করতে হবে। এসব জাহাজ, জনবল ও সংশ্লিষ্ট অপারেশন পরিচালনার দায়িত্ব অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স কন্ট্রাক্টরকে দেওয়া হবে। তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে। এটি সম্পন্ন হলে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে,’ বলেন তিনি।

তবে চলতি বছরের মধ্যেই প্রকল্পটির পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরুর আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘ডাবল পাইপলাইন ব্যবস্থার ফলে একই সঙ্গে ক্রুড অয়েল ও ডিজেল পরিবহন করা সম্ভব। নিয়মিত জ্বালানি আমদানি করা গেলে কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে। বছরে ৯০ লাখ টন জ্বালানি খালাস ও পরিবহন সম্ভব হবে।’

অবকাঠামো প্রস্তুত, কার্যক্রম বন্ধ

মহেশখালীর কালারমারছড়ার ১০০ একর জমিতে স্থাপিত হয়েছে ছয়টি স্টোরেজ ট্যাংক। এর মধ্যে তিনটিতে প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার টন ক্রুড অয়েল এবং বাকি তিনটিতে ৭৫ হাজার টন ডিজেল মজুতের সক্ষমতা রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় মহেশখালী দ্বীপের পশ্চিমের বঙ্গোপসাগরে একটি এসপিএম তথা ভাসমান জেটি স্থাপন করা হয়েছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, এসপিএম ব্যবস্থায় বঙ্গোপসাগরে নোঙর করা বড় জাহাজ থেকে সরাসরি পাইপলাইনে তেল খালাস হয়ে পৌঁছাবে মহেশখালীর টার্মিনালে। সেখান থেকে ২২০ কিলোমিটার অনশোর ও অফশোর পাইপলাইনে যাবে চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারির শোধনাগারে। যার ১৪৬ কিলোমিটারই সমুদ্রের তলদেশে।

এ ছাড়া সোনারপাড়ার প্রকল্পের অভ্যন্তরে এইচডিডি ক্রসিং, পাম্পিং স্টেশন স্থাপন, প্রধান পাম্প, বুস্টার পাম্প, জেনারেটর, স্কাডা, কাস্টডি মিটারিং স্টেশন, পিগিং স্টেশন, সিকিউরিটি সিস্টেম, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, ৩টি ব্লক ভাল্ভ স্টেশন ও ১টি মাইক্রোওয়েভ রিলে স্টেশন ও পাইপলাইন টার্মিনাল ফ্যাসিলিটিজ নির্মাণ করা হয়েছে।

ছবি : এশিয়া পোস্ট

সংকট নিরসনে প্রকল্পটি দ্রুত চালু করা জরুরি

এদিকে প্রকল্পটি চালু থাকলে দেশের প্রায় এক মাসের ক্রুড অয়েল এবং এক সপ্তাহের ডিজেল মজুত রাখা সম্ভব হতো। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতায় এটি বড় ধরনের স্বস্তি দিতে পারত বলে মনে করেন কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সহসভাপতি শেখ আশিকুজ্জামান।

তিনি বলেন, ‘এসপিএম প্রকল্পটি পরিবেশবান্ধব, জ্বালানি সাশ্রয়ী ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর। প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় এ ব্যবস্থায় ক্রুড অয়েল খালাসে সময় কম লাগে। ফলে সময় সাশ্রয়ের পাশাপাশি অপারেশনাল দক্ষতাও বাড়ে। একই সঙ্গে আগের পদ্ধতিতে যে অপচয় হতো, তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।’

শেখ আশিকুজ্জামান আরও বলেন, ‘সরকারের বিপুল বিনিয়োগে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পটি দ্রুত চালু করা জরুরি। বর্তমানে প্রস্তুতিতে ঘাটতি থাকলেও তা দ্রুত সমাধান করা গেলে দেশব্যাপী জ্বালানি সংকট নিরসনে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই দ্রুত অপারেটর নিয়োগসহ প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক ব্যবস্থা সম্পন্ন করে প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা প্রয়োজন।’

প্রকল্প পরিদর্শনে আসছেন জ্বালানি মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী

এদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এবং প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত আজ শুক্রবার এসপিএম প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে আসছেন।

সকাল ১০টায় চট্টগ্রাম বোট ক্লাব থেকে যাত্রা করে তারা প্রথমে সাগরে স্থাপিত এসপিএম বয়া ও এফএসআরইউ পরিদর্শন করবেন। এরপর বিকেলে মাতারবাড়ি জেটিতে নেমে প্রস্তাবিত এলএনজি ও এলপিজি টার্মিনালের স্থান এবং ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিদর্শন করবেন।

আগামীকাল শনিবার সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে তারা মহেশখালীর এসপিএম ট্যাংক ফার্ম ও অন্যান্য স্থাপনা পরিদর্শন করবেন। পরে জিটিসিএলের সিটিএমএসও পরিদর্শনের কথা রয়েছে।