গ্রামের মানুষ চেনেন ‘অচিনবৃক্ষ’ নামে, আসল পরিচয় খুঁজছে বন বিভাগ

বয়স প্রায় দুই শতাব্দী—এমনটাই ধারণা স্থানীয়দের। বিশাল কাণ্ড, ছড়িয়ে থাকা শিকড় আর ডালপালাজুড়ে লতাগুল্মে ঘেরা গাছটি দেখতে অনেকটা বটবৃক্ষের মতো। তবে এটি আসলে কোন প্রজাতির, তা নিশ্চিত করে বলতে পারেন না স্থানীয় কেউ। গাছটির প্রকৃত পরিচয় জানতে আগ্রহী বন বিভাগের কর্মকর্তারাও। ফরিদপুর সদর উপজেলার কানাইপুর ইউনিয়নের ফুরসা গ্রামের এই রহস্যময় বৃক্ষটি স্থানীয় মানুষের কাছে পরিচিত ‘অচিনবৃক্ষ’ নামে।
ফরিদপুর শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে ফুরসা গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে এই বিশাল বৃক্ষ। সময়ের সঙ্গে বদলেছে গ্রামের চেহারা, বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা; কিন্তু গাছটি রয়ে গেছে আগের জায়গাতেই। স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, তাদের বাবা-দাদা ও পূর্বপুরুষদের সময়েও গাছটি ছিল বিশাল আকৃতির। তাদের ধারণা, এর বয়স দুই শতাব্দীর কাছাকাছি। তবে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা বা প্রামাণ্য নথির মাধ্যমে গাছটির বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
রহস্যময় গাছ ঘিরে প্রকৃতির নিজস্ব জগৎ
গাছটির বিশাল কাণ্ড থেকে বেরিয়ে এসেছে অসংখ্য ডালপালা। মাটির ওপর ছড়িয়ে থাকা শিকড়, গায়ে জন্মানো লতাগুল্ম ও অন্যান্য উদ্ভিদ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে ভিন্ন এক প্রাকৃতিক পরিবেশ। দূর থেকে দেখতে বটগাছের মতো মনে হলেও স্থানীয়দের দাবি, এটি বটগাছ নয়। গাছটির প্রজাতি শনাক্ত করার মতো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

বর্ষায় গাছটির চারপাশে ঘন সবুজের সমারোহ দেখা যায়। বৃষ্টিতে ধুয়ে যাওয়া পাতা, মাটির সোঁদা গন্ধ আর বিস্তৃত শাখা-প্রশাখা মিলে তৈরি করে মনোরম পরিবেশ। বিকেলের আলো পাতার ফাঁক দিয়ে মাটিতে পড়লে গাছটির সৌন্দর্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শীতের সকালে কুয়াশায় ঘেরা গাছটিকে ঘিরেও তৈরি হয় রহস্যময় আবহ।
গাছ ঘিরে লোককথা ও জনশ্রুতি
অচিনবৃক্ষকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে নানা লোককথা। কেউ কেউ বলেন, বহু বছর আগে গাছটির নিচে সাধকেরা ধ্যান করতেন। আবার কারও বিশ্বাস, গাছটির সঙ্গে অলৌকিক শক্তির সম্পর্ক রয়েছে। গাছের ডাল ভাঙা কিংবা অকারণে পাতা ছেঁড়াও উচিত নয়—এমন কথাও প্রচলিত আছে এলাকায়।
তবে এসব লোককথা ও বিশ্বাসের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি পাওয়া যায়নি। গাছটির অজানা পরিচয় ও দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকার ইতিহাসই স্থানীয় মানুষের কৌতূহল বাড়িয়েছে।
যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের দাবি
অচিনবৃক্ষের কথা শুনে ফরিদপুর শহরসহ দূর-দূরান্ত থেকে অনেকে ফুরসা গ্রামে আসেন। তাদের একজন সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের শিক্ষার্থী আবরার নাদিম ইতু। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই পরিবারের সদস্যদের কাছে গাছটির কথা শুনেছেন। তবে যাতায়াতব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় দর্শনার্থীদের সেখানে যেতে কিছুটা ভোগান্তি পোহাতে হয়। যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা গেলে আরও বেশি মানুষ গাছটি দেখতে আসতে পারবেন।
কানাইপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ফকির বেলায়েত হোসেন বলেন, ছোটবেলা থেকেই তারা গাছটিকে ‘অচিন গাছ’ নামে চিনে আসছেন। স্থানীয় প্রবীণদের কাছেও গাছটির এই নাম শুনেছেন। গাছটির প্রকৃত পরিচয় জানতে বন বিভাগের কর্মকর্তারা চেষ্টা করছেন বলেও তিনি জানান।

তিনি বলেন, দর্শনার্থীদের যাতায়াতের সুবিধার কথা বিবেচনা করে তিনি দায়িত্বে থাকাকালে ওই এলাকায় রাস্তা নির্মাণ করেছিলেন। এতে গাছটি দেখতে আসা মানুষের পাশাপাশি আশপাশের এলাকার কৃষকেরাও উপকৃত হয়েছেন। তার মতে, একটি প্রাচীন বৃক্ষ হারিয়ে গেলে শুধু একটি গাছই হারায় না; এর সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে এলাকার প্রকৃতি, লোকজ সংস্কৃতি ও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিও।
সংরক্ষণ ও প্রজাতি শনাক্তের তাগিদ
ফরিদপুর পরিবেশ উন্নয়ন ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনির বলেন, পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় গাছটির গুরুত্ব বিবেচনায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে এটি সংরক্ষণের বিষয়ে কাজ করছেন। পাশাপাশি গাছটির প্রকৃত পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য জানার চেষ্টা করছেন।
তার মতে, বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে গাছটির প্রজাতি শনাক্ত, সম্ভাব্য বয়স নিরূপণ এবং পরিবেশগত গুরুত্ব নির্ধারণ করা প্রয়োজন। যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া গেলে গাছটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
ফরিদপুর সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. তারিকুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, লোকমুখে তিনি গাছটির নাম ‘অচিন গাছ’ বলে শুনেছেন। তবে এর প্রকৃত নাম কী, তা জানার চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও কাজ করছেন।
