সুন্দরবনে মুগ্ধ পর্যটকরা চান সারা বছর ভ্রমণের সুযোগ

নদীর ঢেউ, সবুজ ম্যানগ্রোভ বন, বন্যপ্রাণীর বিচরণ আর অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য—সব মিলিয়ে অনন্য সুন্দরবন। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন ও ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ এই বন বাংলাদেশের গর্ব। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে সুন্দরবন বরাবরই আকর্ষণীয় গন্তব্য হলেও সম্ভাবনার এই বিশাল ক্ষেত্রকে এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা, নিরাপত্তা ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে সারা বছর পর্যটন চালুর দাবি জানিয়েছেন পর্যটক ও সংশ্লিষ্টরা।
সুন্দরবনের সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন পর্যটকেরা। বনের সবুজ প্রকৃতি, নদী-খাল আর নির্জন চর দেখে মুগ্ধ হচ্ছেন তারা। তবে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার, নারীদের জন্য আলাদা ওয়াশরুম এবং পর্যটকদের চলাচলের সুযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরছেন অনেকে।
বাগেরহাট থেকে ঘুরতে আসা রায়হান বলেন, সুন্দরবন আমাদের বিশ্ব ঐতিহ্য। ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পাওয়া এই বন দেখতে সবারই আসা উচিত। এখানকার পরিবেশ খুবই চমৎকার। ট্যুর অপারেটর ও গাইডরা আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করছেন। তবে পর্যটকদের সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় পর্যটন বন্ধ থাকলে ভ্রমণের সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। পর্যটন মৌসুম আরও দীর্ঘ করার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।
ঢাকা থেকে আসা ইমন খান বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছি, কিন্তু সুন্দরবন দেখা বাকি ছিল। এবার প্রথম এসে মুগ্ধ হয়েছি। প্রকৃতিকে এত কাছ থেকে অনুভব করার সুযোগ এখানে পাওয়া যায়। ট্যুর অপারেটররা যত্ন নিয়ে পর্যটকদের ঘুরিয়ে দেখাচ্ছেন এবং প্রকৃতি সম্পর্কে সচেতন করছেন। প্রকৃতি না থাকলে আমরা ভালো থাকতে পারব না। তাই সুন্দরবনকে ভালোবাসতে হলে এর প্রকৃতিকে জানতে হবে এবং সংরক্ষণেও সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
পর্যটক তামান্না সুলতানা বলেন, প্রথমবার সুন্দরবনে এসে খুব ভালো লেগেছে। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অসাধারণ। তবে পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য বন বিভাগের তদারকি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা আরও বাড়ানো দরকার। নারীদের জন্য পর্যাপ্ত ও পরিচ্ছন্ন শৌচাগার এবং ওয়াশরুমের ব্যবস্থা থাকলে ভ্রমণ আরও স্বাচ্ছন্দ্যময় হবে। পর্যটন সুবিধা বাড়ানো গেলে আরও বেশি মানুষ এখানে আসতে আগ্রহী হবেন।
ঢাকা থেকে আসা সাজিদ আহমেদ বলেন, সুন্দরবনে এসে প্রকৃতিকে নতুনভাবে অনুভব করছি। ঢাকা শহরে প্রকৃতির এত কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ হয় না। এখানে এসে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশ প্রকৃতির কত বড় সম্পদ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আরেক পর্যটক মেহেদি হাসান বলেন, সুন্দরবনের সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করেছে। তবে পর্যটকদের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা আরও জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও পর্যটনসুবিধা নিশ্চিত করা গেলে আরও বেশি মানুষ সুন্দরবন ভ্রমণে আগ্রহী হবেন।
ট্যুর অপারেটর নাছির উদ্দিন বাদল বলেন, সুন্দরবনকে ঘিরে বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু বছরের নির্দিষ্ট কয়েক মাস পর্যটন কার্যক্রম চালু থাকায় এই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। পরিকল্পিতভাবে সারা বছর পর্যটনের সুযোগ তৈরি করা গেলে পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে। এতে ট্যুর অপারেটর, নৌযান, হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, গাইডসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। তবে পর্যটন বাড়ানোর ক্ষেত্রে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ অক্ষুণ্ন রেখে পর্যটন কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বন সংরক্ষণে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। পর্যটন ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা, সচেতনতা ও নিয়মকানুন মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ। সুন্দরবনকে সুরক্ষিত রেখেই পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঘটাতে হবে।
সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে নিরাপদ নৌযান, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত গাইড ও পর্যটকবান্ধব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে বাড়বে দেশি-বিদেশি পর্যটকের আগমন, রাজস্ব আয় ও স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান।
সঠিক পরিকল্পনা ও সরকারি উদ্যোগে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি পর্যটনশিল্পের নতুন দিগন্ত উন্মোচন সম্ভব।

