logo

২ বছর বন্ধ থাকায় যমুনা সার কারখানার ক্ষতি ২৮০০ কোটি

২ বছর বন্ধ থাকায় যমুনা সার কারখানার ক্ষতি ২৮০০ কোটি

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইউরিয়া সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (জেএফসিএল)। কারখানাটি টানা প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকায় উৎপাদন ঘাটতি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়সহ মোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। যার ফলে জামালপুর, শেরপুর, টাঙ্গাইলসহ উত্তরবঙ্গের অন্তত ১৯ জেলার কৃষকের সার সরবরাহ নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। একইসঙ্গে বাড়ছে আমদানি নির্ভরতার ঝুঁকি।

২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর থেকেই ইউরিয়া উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায় কারখানাটিতে। এরপর থেকেই শুরু হয় লোকসানের হিসাব-নিকাশ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জেএফসিএলের বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৪ লাখ ৮০ হাজার টন ইউরিয়া। সেই হিসাবে দুই বছরে উৎপাদনের কথা ছিল ৯ লাখ ৬০ হাজার টন। কিন্তু কারখানা বন্ধ থাকায় এই পরিমাণ সার উৎপাদন সম্ভব হয়নি। প্রতি টন ইউরিয়া উৎপাদনে ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২৫ হাজার টাকা। উৎপাদন না হওয়ায় সম্ভাব্য ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে সরকার।

অপরদিকে কারখানা প্রায় ২ বছর বন্ধ থাকায় শুধু প্রতিষ্ঠানটি সচল রাখতেই গুনতে হয়েছে ৩৬০ কোটি টাকা। এর পাশাপাশি এই সময়ের মধ্যে ৯ লাখ ৬০ হাজার টন সার উৎপাদন হওয়ার কথা থাকলেও সম্ভব হয়নি। এতে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পুরোপুরি ব্যর্থ হয় কারখানাটি। উৎপাদন ঘাটতি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় মিলিয়ে মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।

এদিকে দেশীয় উৎপাদন বন্ধ থাকায় আমদানি নির্ভরতা বেড়েছে। কারখানা থেকে জানা যায়, যে সার দেশেই ২৫ হাজার টাকায় উৎপাদন সম্ভব, তা আমদানি করতে হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার টাকা করে। অর্থাৎ প্রতি টনে অতিরিক্ত প্রায় ৩৫ হাজার টাকা বেশি গুনতে হয়েছে। শুধু জামালপুর জেলায় চাহিদা মেটাতে আমদানি করা হয়েছে ১ লাখ ৪৪ হাজার ২৩৯ টন ইউরিয়া। এতে অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ৫০৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকার বেশি (প্রতি টনে ৩৫ হাজার টাকা হিসাবে)।

এ ছাড়াও কারখানাটি বন্ধের পরেও যন্ত্রপাতি, জনবল ও অবকাঠামো সচল রাখতে প্রতি বছর গুনতে হয়েছে প্রায় ১৮০ কোটি টাকা। দুই বছরে সেই ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩৬০ কোটিতে।

কারখানা বন্ধ থাকায় শুধু সরকার নয়, ক্ষতির মুখে পড়েছেন স্থানীয় ডিলার ও কৃষকরাও। আমদানি করা নিম্নমানের সারের পাশাপাশি বাড়তি পরিবহন ব্যয়ও দিতে হয়েছে বলছেন ডিলাররা। এতে কৃষকদেরও বেশি দামে সার সংগ্রহ করতে হয়েছে বলে জানান তারা।

ডিলার ইকরামুল হক নবীন বলেন, যমুনা সার কারখানা দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় আমাদের সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সার সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে পরিবহন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। দূর-দূরান্ত থেকে সার আনতে গাড়ি ভাড়া দিতে হচ্ছে, ফলে ব্যবসা পরিচালনায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। আগে কারখানা চালু থাকলে খুব সহজেই স্বল্প খরচে সার সংগ্রহ করা যেত। এখন দূরের এলাকা থেকে সার আনতে গিয়ে সময়ও বেশি লাগছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থাতেও নানা জটিলতা দেখা দিচ্ছে।

এ বিষয়ে জামালপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আলম শরীফ খান এশিয়া পোস্টকে বলেন, যমুনা সার কারখানা চালু রাখা খুবই জরুরি। কারণ, এই কারখানা চালু থাকলে জামালপুরসহ আশপাশের জেলাগুলোতে সহজেই সার সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এতে কৃষকরা তাদের চাহিদা অনুযায়ী হাতের কাছেই সার পেয়ে যাবেন।

যদি ১২ মাস গ্যাস পাওয়া যায় তাহলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে বলে জানান জেএফসিএলের বিভাগীয় প্রধান (অপারেশন) মো. ফজলুল হক। এ সময় তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমরা যদি ১২ মাস নিয়মিত গ্যাস পাই, তাহলে আমাদের উৎপাদন অনেকটাই বৃদ্ধি পাবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রাও অনেকটা সাশ্রয় হবে। বর্তমানে যে সার আমরা বাইরে থেকে আমদানি করি, তখন আর এত বেশি আমদানি করতে হবে না। আমরা যদি বছরে তিন থেকে চার লাখ টন উৎপাদন করতে পারি, তাহলে সরকারের অনেক অর্থ সাশ্রয় হবে।’

গত ২৩ ডিসেম্বর থেকে পুনরায় গ্যাস সংযোগ পাওয়ার পর উৎপাদনে ফিরেছে কারখানাটি। এ ছাড়াও মাঝেমধ্যে নানা কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে কারখানাটির। জামালপুরের সরিষাবাড়ীর তারাকান্দিতে ১৯৯১ সালে স্থাপিত কেপিআই-১ মানসম্পন্ন এই শিল্প প্রতিষ্ঠানের দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ১ হাজার ৭০০ টন। বর্তমানে নানা প্রযুক্তিগত ও সরবরাহ জটিলতায় তা নেমে এসেছে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টনে।