অন্ধকার পেরিয়ে আলোর পথযাত্রী

বিশ্বে তখন দমবন্ধ অবস্থা। চারদিকে হাহাকার। বেঁচে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা। মানুষজন ঘরবন্দি। প্রতি মুহূর্তে আসছে মৃত্যুর সংবাদ। এমন বিভৎস সময়ে নিজের স্বপ্ন নিয়ে আলের পথে হাঁটা শুরু করলেন এক নারী। অবশ্য অনেকটা পথ হেঁটে আলোর দিশা পেয়েছেন তিনি।
এই নারী একজন উদ্যোক্তা। নাম তার শিখা চাকমা। মহামারি করোনাভাইরাসের সময় ২০১৮ সালে ব্যবসা শুরু করেন তিনি। বিনিয়োগ ছিল মাত্র ২০ হাজার টাকা। এখন তা সাড়ে ৭ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। খরচ বাদ দিয়ে প্রতিমাসে ৩০ হাজার টাকা লাভ হয়।
শিখার প্রতিষ্ঠানের নাম ‘শিখা ফ্যাশন অর্নামেন্ট’। এখানে আদিবাসী নারীদের সাজসজ্জার জিনিস পাওয়া যায়; যা তিনি নিজ ডিজাইন করেন। যদিও শুরুতে স্বর্ণ দোকানের কারিগরের পরামর্শ নিয়ে গয়না বানানো শুরু করেছিলেন। বেশির ভাগই অনলাইনে বিক্রি হয় তার ডিজাইন করা গয়নাগুলো।
অমর কান্তি চাকমার বড় মেয়ে শিখা চাকমা। পরিবারে বাবা-মা আর এক বোন আছে। বাড়ি ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা মিজোরামের এপার-ওপার দুর্গম বরকল উপজেলার আইমাছড়া ইউনিয়নের ঠেগা আন্দার মানিক গ্রামে। গ্রামে নেই ইন্টারন্টে ব্যবস্থা।
শুরুর জার্নিটা কেমন ছিল
দরিদ্র পরিবারে জন্ম শিখার। বাবা-মা কৃষিকাজ করেন। কৃষিকাজ করে সংসার চলত। বাবার কষ্ট সহ্য হচ্ছিল না শিখার। মাকে জানান ব্যবসা করবেন; আধিবাসী ঐতিহ্যবাহী গয়না ব্যবসা। স্বজনদের থেকে সুদ হিসেবে ২০ হাজার টাকা নেন মা রাজলক্ষ্মী চাকমা। উদ্যোম নিয়ে শিখা চলে আসনে রাঙামাটি শহরে। নেন বাসা ভাড়া। কারিগরের সঙ্গে কথা বলে গয়না ব্যবসা শুরু করেন। এখন ব্যবসার লাভের টাকা কিছু অংশ বাবা-মাকে পাঠিয়ে দেন।
কেমন গয়না, বিক্রি কেমন
আদিবাসী নারীদের সাজসজ্জার ঐহিত্যবাহী সংস্কৃতির গয়না দেশে বহুল পরিচিত। আদিবাসী নারীরা তাদের ঐতিহ্যবাহী পিনোন-হাদি পরে ঐতিহ্যবাহী গয়না পরলে বেশ সুন্দর দেখায়। তবে সেসব গয়নার সুন্দর-সুন্দর ডিজাইন দিয়ে থাকেন শিখা চাকমা। সিলভার এবং গোল্ডপ্লেট দুই ধরনের গয়না বানাচ্ছেন তিনি। সিলভার প্লেটের মধ্যে যেমন হাসুলি, পায়ের হারু (পায়ের বালা) হুজিহারু, আলছড়া (এক হতে পাঁচ লহর পর্যন্ত পয়সা মালা) নতুন বৌয়ের গয়না ইত্যাদি। গোল্ড প্লেটের মধ্যে যেমন নেকলেস, সিতাহার, বালা, টিকলি, টায়রা ইত্যাদি।
এসব গয়নাগুলো ডিজাইন এবং ওজন অনুযায়ী দাম হয়ে থাকে। সিলভার প্লেটের হাসুলি ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত। হুজিহারু সর্বনিম্ন ৫০০ থেকে শুরু হয়ে ১০০০ টাকা পর্যন্ত, আলছড়া ৮০০ হতে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম হয়ে থাকে। প্রতি গয়না থেকে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা লাভ হয়ে থাকে।
ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় পাইকারি হিসেবে কিনে নিয়ে যান গ্রাহকরা। এ ছাড়া ভারতের ত্রিপুরা, মিজোরাম, থাইল্যান্ড, জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে গ্রাহকরা খুচরা ও পাইকারি কিনে নিয়ে নেয়।
বোনের দায়িত্বও নিয়েছেন
নিজ উপজেলা বরকল মডেল সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন শিখা চাকমা। এরপর ভর্তি হন রাঙামাটি শহরের মহিলা কলেজে। এইচএসসি পাস করে ২০২৫ সালে বাংলাদেশ উম্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাস করেন। বর্তমানে মাস্টার্সে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
তার একমাত্র বোনকে রাঙামাটি সরকারি কলেজে পড়াশোনা করাচ্ছেন। সামনে এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছোট বোনটি। ছোটবোনের সব খরচ চালাতে হচ্ছে তাকে। ব্যবসার ফাঁকে নিজেও পড়ছেন তেমনি বোনকেও পড়াচ্ছেন।
আক্ষেপও আছে
বহু চেষ্টা করেও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে সহায়তা বা অনুদান পাননি বলে আক্ষেপ করেন শিখা। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ এমনকি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে অনুদানের দরখাস্ত দিয়েও মেলেনি।
শিখা চাকমা বলেন, সুপ্রদীপ চাকমার (সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা) সঙ্গে দেখা না করে রাঙামাটির ঈুঁজিনারী উদ্যোক্তা খাদ্যশস্য অনুদান পেয়েছেন। অথচ সরাসরি উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করে দরখাস্ত দিয়েও অনুদান পাইনি। সবখানে সিন্ডিকেট।