
নীলফামারীর তিন লাখের বেশি মানুষের একমাত্র ভরসাস্থল ৫০ শয্যার ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। অথচ জনবল সংকটের কারণে হাসপাতালে দৈনন্দিন চিকিৎসাসেবা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। হাসপাতালটিতে অনুমোদিত চিকিৎসক পদ ৩৩টি। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৭ জন। কিন্তু তাদের মধ্যে চারজন দীর্ঘদিন ধরে প্রেষণে অন্যত্র দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে বাস্তবে হাসপাতালে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ১৩ জন চিকিৎসক।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রেষণে অন্যত্র কর্মরত চার চিকিৎসক হলেন— জুনিয়র কনসালট্যান্ট (ইএনটি) ডা. রিপন কুমার সরকার, প্যাথলজিস্ট ডা. নিরঞ্জন কুমার রায়, মেডিকেল অফিসার ডা. সাজেদুর রহমান চৌধুরী এবং সহকারী সার্জন ডা. মৌসুমী বৈষ্ণব। অন্যত্র দায়িত্ব পালন করলেও এসব চিকিৎসকের বেতন-ভাতা ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মরত হিসেবেই উত্তোলন করা হচ্ছে।
হাসপাতালটিতে প্রতিদিন বহির্বিভাগে গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। ভর্তি রোগীর সংখ্যাও প্রায়ই ১০০ ছাড়িয়ে যায়। এত বিপুল রোগীর চাপের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত চিকিৎসক মাত্র ১৩ জন।
কর্মরত চিকিৎসকদের মধ্যে দুজন ডেন্টাল সার্জন। বাকি ১১ জন মেডিকেল অফিসার। তাদের একজনকে আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ফলে বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ, ওয়ার্ড ও প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে চিকিৎসকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন নারী ও শিশুরা। হাসপাতালে শিশু ও গাইনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। অন্যদিকে ইএনটি বিভাগের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. রিপন কুমার সরকার প্রেষণে অন্যত্র থাকায় নিয়মিত নাক-কান-গলা রোগীদের বিশেষজ্ঞ সেবাও ব্যাহত হচ্ছে। ফলে জটিল রোগী কিংবা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার প্রয়োজন এমন রোগীদের অনেক ক্ষেত্রেই নীলফামারী সদর বা রংপুরে পাঠানো হচ্ছে। এতে রোগীর চিকিৎসার পাশাপাশি বাড়ছে যাতায়াত, সময় ও অর্থের চাপ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পাওয়ার সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্যক্তি রোগী ও স্বজনদের বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক কিংবা চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এতে কেউ কেউ দালালের খপ্পরে পড়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ডিমলা উপজেলার মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি চিকিৎসার অন্যতম প্রধান ভরসা। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, উপজেলায় তিন লাখ ১৬ হাজারের বেশি মানুষের বসবাস। উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা, তিস্তা নদী তীরবর্তী চরাঞ্চল ও নদীভাঙনপ্রবণ এলাকার মানুষের কাছে স্থানীয় সরকারি হাসপাতালের গুরুত্ব আরও বেশি। এসব এলাকার অনেক মানুষ সীমিত আয়ের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সামান্য চিকিৎসার জন্যও দূরের হাসপাতালে যাওয়া তাদের জন্য বাড়তি চাপ।
হাসপাতালটিতে শুধু চিকিৎসক সংকটই নয়, অন্যান্য জনবল সংকটও রয়েছে। ওয়ার্ডবয় ও আয়ার পদ শূন্য রয়েছে। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতাকর্মীও রয়েছেন মাত্র একজন। ফলে রোগীর চিকিৎসার পাশাপাশি হাসপাতালের দৈনন্দিন সেবা ও পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থাপনাতেও রয়েছে ভোগান্তি।
এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার (ইউএইচএফপিও) পদও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। বর্তমানে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে হাসপাতালের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের চরখড়িবাড়ী গ্রামের কৃষক ওয়াহাব আলী বলেন, আমরা ছোটবেলা থেকেই এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছি। কষ্ট করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার সাধ্য আমাদের নেই। আমরা চাই, সরকারি এই হাসাতেই যেন সব ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হয়।
খগাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের দোহলপাড়া গ্রামের গৃহবধূ লিলি বেগম বলেন, আমাদের মতো সাধারণ ও গরিব মানুষের রংপুরে গিয়ে চিকিৎসা করানো সম্ভব নয়। আমরা চাই, সিজারিয়ান অপারেশনসহ ছোট-বড় সব ধরনের অস্ত্রোপচার যেন এই হাসপাতালেই হয়।
ডিমলা সদরের আরেক বাসিন্দা আরমান ওয়াহিদ বলেন, এমনিতেই সরকারি মেডিকেলে ডাক্তাররা ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করেন না, আবার সংকট হলে ভোগান্তি চরম লেভেলে পৌঁছাবে। আমরা যারা মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ, প্রাইভেট ক্লিনিকে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষমতা কি আমাদের আছে?
ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার (ইউএইচএফপিও) অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত ডা. মো. আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, হাসপাতালে ৩৩টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে চিকিৎসক আছেন ১৭ জন। এর মধ্যে চারজন এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে বেতন নিলেও দীর্ঘদিন ধরে অন্যত্র কর্মরত। বর্তমানে হাসপাতালে কর্মরত রয়েছেন ১৩ জন চিকিৎসক। তাদের মধ্যে দুজন ডেন্টাল সার্জন। সীমিত জনবল নিয়ে সেবা দিতে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিষয়টি লিখিতভাবে জেলা সিভিল সার্জনসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করছি, দ্রুত পদগুলো পূরণ হবে।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমাদের ডিমলায় বর্তমানে কোনো ডাক্তার সংকট নেই, শুধুমাত্র কনসালট্যান্টের সমস্যা রয়েছে। ৪৮তম বিসিএসের পর আমরা মোটামুটি ডাক্তার পেয়েছি, এখন আমাদের ডাক্তার সংকট নেই। অন্য মেডিকেলে দায়িত্ব পালন করে আরেক মেডিকেলের নামে বেতন তুলতে পারেন কি না—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এমন হওয়ার কথা নয়।

