দেশে ফেরার পথে সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল সুনামগঞ্জের আমিন উদ্দিনের

সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত চার প্রবাসীর মধ্যে একজন সুনামগঞ্জের বাসিন্দা। তিনি সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের বর্মাউত্তর গ্রামের মৃত মকবুল হোসেনের ছেলে আমিন উদ্দিন (৪৭)।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টার দিকে জেদ্দা বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে সৌদি আরবের রিয়াদ-তায়েফ সড়কের আল-কোরমা এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে। প্রায় ২৭ বছর ধরে সৌদি আরবে বসবাস করছিলেন আমিন উদ্দিন। তিনি সৌদি আরবের তায়েফ এলাকায় একটি গার্মেন্টস ব্যবসা করতেন। তাঁর দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে।
নিহত আমিন উদ্দিনের পরিবার সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার জয়নগর বাজার এলাকায় বসবাস করে। মঙ্গলবার তার দেশে পৌঁছানোর কথা ছিল। এর আগে তিনি পরিবারের সদস্যদের কাছে ফিরতি বিমান টিকিটের ছবিও পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু দেশে ফেরার কয়েক ঘণ্টা আগেই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তিনি। ছয় ভাইয়ের মধ্যে আমিন উদ্দিন ছিলেন তৃতীয়।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, দেড় মাসের ছুটি নিয়ে দেশে ফিরছিলেন আমিন উদ্দিন। আগামী ২৩ নভেম্বর সৌদি আরবে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল তার। এ জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে জেদ্দা বিমানবন্দরের ফিরতি টিকিটও সংগ্রহ করেছিলেন। দেশে ফেরার উদ্দেশ্যে জেদ্দা বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে তাদের বহনকারী গাড়িটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। এতে গাড়িটি দুমড়েমুচড়ে যায়।
নিহতের পরিবারের সদস্যরা জানান, সোমবার বিকেল ৪টা ২৭ মিনিটে সৌদি আরব থেকে আমিন উদ্দিন বাংলাদেশে থাকা তার ছোট ভাই জসিম উদ্দিনকে বিমানের টিকিটের ছবি পাঠান। একই সঙ্গে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টায় সিলেট এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে নিয়ে আসতে বলেন। দীর্ঘদিন পর প্রিয়জন দেশে ফিরছেন—এমন খবরে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আনন্দের পরিবেশ তৈরি হয়। আমিন উদ্দিনের ছেলে-মেয়েরাও বাবার অপেক্ষায় ছিল।
কিন্তু এর কয়েক ঘণ্টা পরই আসে মর্মান্তিক খবর। সৌদি আরবে অবস্থানরত আরেক ভাই আব্দুল আউয়াল কলিম উদ্দিন বাড়িতে ফোন করে জানান, সড়ক দুর্ঘটনায় আমিন উদ্দিন মারা গেছেন।
পরিবার সূত্রে আরও জানা যায়, প্রায় ২৭ বছর ধরে সৌদি আরবে অবস্থান করছিলেন আমিন উদ্দিন। সর্বশেষ গত বছরের ৩ আগস্ট তিনি দেশে এসেছিলেন। এবার দেড় মাসের ছুটিতে তার মঙ্গলবার সকালে দেশে পৌঁছানোর কথা ছিল। তবে দেশে ফেরার পরিবর্তে তার মরদেহ বর্তমানে সৌদি আরবের তায়েফ আল-মরুয়া এলাকার একটি হাসপাতালের মর্গে রয়েছে বলে জানা গেছে।
নিহত আমিন উদ্দিনের ছোট ভাই মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনের ভাষ্য অনুযায়ী, তায়েফ থেকে জেদ্দা বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে আমিন উদ্দিনসহ আরও চারজন একটি গাড়িতে করে রওনা হন। গাড়িটির মূল চালকের ভাতিজাও দেশে আসার জন্য একই গাড়িতে উঠেছিলেন।
যাত্রা শুরুর আগে গাড়ির মূল চালকের ভাতিজা তার চাচাকে বলেন, চাচা, আপনি মুরব্বি মানুষ, আমি গাড়ি চালাচ্ছি। আপনি তাদের সঙ্গে বসুন। এরপর তিনি গাড়ি চালিয়ে জেদ্দা বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথে তায়েফের রিয়াদ-তায়েফ সড়কের আল-কোমরা এলাকায় গাড়িটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। এতে আমিন উদ্দিন, গাড়ির মূল চালকসহ চারজন নিহত হন। দুর্ঘটনার পর গাড়ির চালকের ভাতিজা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এ ঘটনায় নিহত আমিন উদ্দিনের ভাই সৌদি প্রবাসী মাওলানা আব্দুল আওয়াল ও মাওলানা কলিম উদ্দিন তায়েফের এরজোয়ান থানায় পলাতক চালকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন।
নিহতের ছোট ভাই মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, সোমবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে আমার ভাই আমাকে ফোন করে বলেছিল, মঙ্গলবার সকালে সিলেট বিমানবন্দর থেকে তাকে নিয়ে আসার জন্য। এই খবরে আমাদের পরিবারের সবাই আনন্দিত ছিলাম। তাকে দেশে নিয়ে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরই সৌদি প্রবাসী আরেক ভাই কলিম উদ্দিন আমাকে জানান, আমাদের ভাই সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন।
তিনি বলেন, আমার বড় ভাইয়ের তিনটি সন্তান। তাদের আমরা এখন কী জবাব দেব? আমরা আমাদের ভাইকে হারিয়েছি। এখন আমাদের একটাই দাবি, তার মরদেহ যেন দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। বড় ভাইয়ের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সহযোগিতা চাই।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত আমিন উদ্দিনের পরিবারের সঙ্গে কথা হয়েছে। তার লাশ দেশে আনার বিষয়ে আমাদের কোনো সহযোগিতার প্রয়োজন হলে আমরা তাদের সহযোগিতা করব। বিষয়টি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) স্যারকে অবগত করেছি। তার পরিবারের লোকজন আগামীকাল আসবেন বলে জানিয়েছেন। তাদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


