logo

১০ বার অভিযানের পরও থামেনি মুফতির সিসা তৈরি

১০ বার অভিযানের পরও থামেনি মুফতির সিসা তৈরি
বাইরে ঝুলছে সিলগালার তালা। ভিতরে রাতের আঁধারে চলে সিসা তৈরি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রশাসন। একের পর এক অভিযানে ভেঙে দেওয়া হয়েছে চুল্লি, কেটে দেওয়া হয়েছে বিদ্যুৎ সংযোগ, করা হয়েছে জরিমানা ও সিলগালা। এমনকি করা হয়েছে নিয়মিত ফৌজদারি জিআর মামলাও। কিন্তু কোনো আইনি পদক্ষেপেই থামানো যাচ্ছে না ক্ষমতাধর মুফতি সৈয়দ মাহাদী হাসান বুলবুলকে। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে আশুলিয়ার শিমুলিয়া ইউনিয়নের রাঙামাটি এলাকায় অবলীলায় চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে অবৈধভাবে ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা সংগ্রহের কাজ। গত দুই বছরে ১০টির অধিক অভিযান পরিচালিত হয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটিতে। একই এলাকার টায়ার পোড়ানোর কারখানার চিত্র একই।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের অভিযানের পর দুদিন কাজ বন্ধ রাখলেও আবার শুরু হয় একই কারবার। সবশেষ অভিযানের পর সিলগালা করে তালা ঝুলিয়ে দেয় প্রশাসন। কিন্তু ভেতরে বিষাক্ত টায়ার পুড়িয়ে তেল তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বুলবুল ও তার সিন্ডিকেট। এর পাশেই রয়েছে টায়ার পুড়িয়ে তেল সংগ্রহের কাজ। এর বিষাক্ত ঝাঁজালো গন্ধ দিন-রাত এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকে। বিশেষ করে রাতে শ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম।

জানা যায়, ২০২৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর পরিবেশ অধিদপ্তর অভিযান চালিয়ে কারখানার বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক মেশিনপত্র জব্দ করে। ২০২৫ সালের ১৫ মে গোপনে কারখানা চালানোর প্রতিবাদ করায় স্থানীয় ছাত্রদের ওপর হামলা চালায় কারখানার লোকেরা। এতে অন্তত ৮ জন আহত হন। ২০২৫ সালের ২৩ জুন পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কিশোর কুমার দাসের নেতৃত্বে যৌথ বাহিনী উচ্ছেদ অভিযান চালায়। পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্দেশে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ কারখানার প্রধান বিদ্যুৎ লাইন ও ট্রান্সফরমার সংযোগ সম্পূর্ণ কেটে দেয়। তার কিছুদিন পর থেকেই পুনরায় রাতের আঁধারে চালাতে থাকে অবৈধ কারখানাটি।

২০২৬ সালেও বেশ কয়েকবার অভিযান চালিয়ে ভেঙে দেওয়া হয় মেশিনপত্র। পরবর্তীতে গত ২৫ আগস্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মহিবুল্লাহ আকনের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত গভীর রাতে হানা দিয়ে ভেকু দিয়ে চুল্লি গুঁড়িয়ে পুনরায় সিলগালা করে। শুধু তাই নয়, পরিবেশ অধিদপ্তর মূল হোতা মুফতি সৈয়দ মাহাদী হাসান বুলবুল ও সহযোগীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধে জিআর মামলা দায়ের করে।

কারখানা এলাকায় সরেজমিনে দিনে ও রাতে গিয়ে দেখা যায় দুই ভিন্ন চিত্র। দিনের বেলা কারখানার মূল ফটকে ঝুলতে দেখা যায় প্রশাসনের দেওয়া পৃথক প্রতিষ্ঠানে সিলগালার দুটি তালা। চারপাশ একদম নীরব ও নিঝুম মনে হলেও কারখানার পেছনের অংশে সীমানা প্রাচীর ঘেঁষে চলে কার্যক্রম। রাতের অন্ধকার নামতেই বদলে যায় ভেতরের দৃশ্য। গভীর রাতে বিকল্প পথ ব্যবহার করে কারখানার ভেতরে ঢোকানো হয় ব্যবহৃত পুরোনো ব্যাটারি। জেনারেটর বা বিকল্প উপায়ে বিদ্যুৎ সংস্থান করে গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত চালানো হয় চুল্লি। রাতের আঁধারে চুল্লি থেকে বের হওয়া কালচে ধোঁয়ায় ছেয়ে যায় চারপাশের বাতাস। আর ছড়িয়ে পড়ে তীব্র ঝাঁজালো ও বিষাক্ত গন্ধ। দিনের আলো ফোটার আগেই আবার কাজ বন্ধ করে পেছনের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়, যেন বাইরে থেকে বোঝার উপায় না থাকে। তবে প্রতি রাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ট্রাকে করে নিয়ে আসা হয় ব্যাটারি ও টায়ার।

প্রশাসনের একাধিক ব্যবস্থার পরও কারখানা চালু থাকায় চরম হতাশা প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। রাঙামাটি এলাকার লাভলু মিয়া বলেন, স্যাররা ভেকু দিয়ে চুল্লি ভেঙে সিলগালা করে গেলেন। পুলিশ মামলাও দিল। ভেবেছিলাম এবার রক্ষা পাব। কিন্তু বাইরে তালা ঝুলিয়ে পেছনের দিকে রাতে টায়ার পোড়ানো হচ্ছে। বিষাক্ত ধোঁয়ায় রাতে শ্বাস নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এখন পর্যন্ত অনেক বার অভিযান হয়েছে। তবে বন্ধ হয়নি স্থায়ীভাবে।

একই এলাকার গৃহিণী বিউটি আক্ষেপ করে বলেন, রাত হলেই আগুন জ্বালিয়ে কি যে পোড়ায়। গন্ধে ঘুমানো যায় না। বাচ্চারা কান্নাকাটি করে। শুনলাম বন্ধ হবে। কিন্তু বন্ধ করে একদিন পরেই আবার শুরু করে। তাদের যখন উচ্ছেদ করা যাচ্ছে না, তাহলে আমাদের সরিয়ে দিতে পারে। তারা তো প্রশাসনকে তোয়াক্কা করে না।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নিতে অভিযুক্ত মুফতি সৈয়দ মাহাদী হাসান বুলবুলের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে তার সম্ভাব্য অবস্থান ও কারখানার আশপাশে গিয়েও তাকে সরাসরি পাওয়া যায়নি। তবে ওই কারখানার ম্যানেজার হিসেবে পরিচিত ইমরান নামের এক ব্যক্তি মুঠোফোনে জানান, কারখানায় আগের মতো কাজ হয় না। মোটামুটি বন্ধ আছে সব কিছু।

শিমুলিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মশিউর রহমান মিন্টু এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমরা এই কারখানা বন্ধের পক্ষে। আমি ব্যক্তিগতভাবে এটি পরিচালনার পক্ষে নই। এর আগে একাধিক অভিযানে তৎকালীন প্রশাসনকে সাথে নিয়ে আমি নিজেই উচ্ছেদ অভিযানে সহযোগিতা করেছিলাম। কিন্তু রাতের অন্ধকারে অবৈধভাবে আবার এটি চালানো হয়। এই অবৈধ কারখানা অবিলম্বে স্থায়ীভাবে বন্ধ করা উচিত।

সাভার উপজেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমরা এর আগেও সেখানে কয়েকবার অভিযান পরিচালনা করেছি। তবে অভিযানের সময় মূল অপরাধীদের হাতেনাতে ধরা সম্ভব হয় না। তারা পালিয়ে যায়। পরিবেশ রক্ষায় এ বিষয়ে একটি কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করে দ্রুতই স্থায়ী সমাধান করা হবে।

এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর ঢাকা জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. ইলিয়াস মাহমুদ এশিয়া পোস্টকে জানান, উক্ত কারখানার বিরুদ্ধে একাধিকবার মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে পরিবেশ আইনে জিআর মামলাও চলমান।

তিনি আরও বলেন, এসব কারখানার কোনো বড় অবকাঠামোগত বিনিয়োগ না থাকায় ভেঙে দেওয়ার পরও তারা পুনরায় তা তৈরি করে ফেলে। এসব অবৈধ ব্যাটারি ও টায়ার পোড়ানোর কারখানার বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরের জিরো টলারেন্স নীতি বহাল রয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে পুনরায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি দায়ের করা মামলায় আসামিকে গ্রেপ্তারে থানা পুলিশের দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন।