logo

বরফ সিন্ডিকেটে অসহায় মৎস্যজীবীরা

বরফ সিন্ডিকেটে অসহায় মৎস্যজীবীরা
বরগুনার পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে বরফ দিয়ে রাখা ইলিশ মাছ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ইলিশের ভরা মৌসুমে চরম বিদ্যুৎ বিভ্রাটে পড়েছে দেশের ২য় সর্ববৃহৎ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র বরগুনার পাথরঘাটার বিএফডিসি ঘাটের মৎস্যজীবীরা। তীব্র লোডশেডিংয়ে বরফ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কারণে ইলিশ মৌসুমের শেষের দিকে মাছ সংরক্ষণ করতে পারছে না আড়তদার-পাইকাররা। এই সুযোগে মিল মালিকরা ২০০ টাকার বরফ বিক্রি করছেন ৬০০ টাকায়।

মৎস্যজীবীদের অভিযোগ, একদিকে নিম্নমানের অপরিপক্ব বরফ, অন্যদিকে তিনগুণ বেশি দামে সিন্ডিকেট করে বরফ বিক্রি করছে বরফ মিল মালিকরা।

তবে মিল মালিকরা বলছেন, লোডশেডিংয়ের কারণে বরফ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় নিম্নমানের বরফ উৎপাদন করতে হচ্ছে, আর পরিপক্ব বরফ উৎপাদনে খরচ বেশি, তাই দামটাও বেশি।

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র বরগুনার পাথরঘাটা। এ ঘাটকে কেন্দ্র করে ব্যবসার জন্য এখানে আসেন দেশের অন্তত ১৩টি জেলার মৎস্যজীবীরা। তাদের বরফের চাহিদা মেটাতে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের চারপাশে গড়ে উঠেছে ২২টি বরফ মিল। তবে, সম্প্রতি লোডশেডিংয়ের কারণে বেশিরভাগ বরফ মিল থেকে নিম্নমানের অপরিপক্ব বরফ বিক্রির অভিযোগ জেলে ও মৎস্যজীবীদের।

এফ বি ভাই ভাই কোম্পানির ম্যানেজার জামাল অভিযোগ করে বলেন, ৪টি ট্রলারে বরফ নিয়ে সাগরে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু বরফ দিয়েছে নিম্নমানের অপরিপক্ব বরফ। ইলিশ মৌসুমের শেষ মুহূর্তে এসে অল্প কিছু ইলিশ উঠেছিল জালে। কিন্তু মাছ নিয়ে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে আসতে আসতে বরফ গলে পানি হয়ে গেছে। পরে নামমাত্র মূল্যে মাছ বিক্রি করে দিয়েছি। চারটি ট্রলার সাগরে পাঠাতে যা খরচ হয়েছে, তার অর্ধেকও ওঠেনি।

তিনি আরও বলেন, প্রথম শ্রেণির বরফ কিনতে গিয়ে দেখি ৬০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে এক ক্যান বরফ। অথচ এই বরফের দাম ছিল সর্বোচ্চ ২০০ টাকা।

চাহিদা অনুযায়ী বরফ না পেয়ে মিলের আশপাশের খাল ও নদীতে নোঙর করে আছে শত শত সমুদ্রগামী মাছ ধরা ট্রলার। জেলেরা বলছেন, বরফ সংকটে মিলের সঙ্গে সঙ্গে থমকে গেছে জেলে জীবনের চাকা।

এফ বি শুক্কুর ট্রলারের জেলেরা জানান, গতকাল জ্বালানি রসদ নিয়ে বরফের জন্য মিলে যাচ্ছি। অপরিপক্ব বরফের ক্যান ২৫০-৩০০ টাকায় বিক্রি করে, কিন্তু পরিপক্ব বরফ ৬০০ টাকার নিচে কোনো মিল মালিক বিক্রি করতে রাজি হন না।

বিভিন্ন বরফ মিলে জেলেদের সঙ্গে কথা বললে তারা অভিযোগ করে বলেন, লোডশেডিংয়ের অজুহাতে বরফ মিল মালিকরা সিন্ডিকেট করে তিনগুণ বেশি দামে বরফ বিক্রি করছে।

এদিকে আড়তদার-পাইকাররা বলছেন, বরফ সংকটে ঢাকাসহ দেশের অন্তত ১০ জেলায় মাছ সরবরাহ বন্ধ হয়ে আছে।

মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের আড়তদার পদ্মা ফিশিং কোম্পানির মালিক সতীন্দ্রনাথ বালা বলেন, বরফ সংকটে নষ্ট হচ্ছে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। নিম্নমানের বরফ দিয়ে মাছ সংরক্ষণ করলে মাছের গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়। এতে একদিকে যেমন দূরদূরান্তের পাইকারদের সঙ্গে অসুসম্পর্ক হয়, তেমনি ভোক্তাদের সঙ্গেও প্রতারণা করা হয়। যার প্রভাব পড়বে ভবিষ্যৎ ব্যবসার ক্ষেত্রে। কিন্তু পরিপক্ব বরফ বিক্রি হচ্ছে তিনগুণ দামে। আর এই দামের প্রভাব পড়ছে বাজারে।

মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের পাইকার মজনু মিয়া বলেন, গত সপ্তাহে এক কেজির ইলিশের মণ বিক্রি করেছি এক লাখ ২০ হাজার টাকা। বরফ সংকটে এখন সেই ইলিশ বিক্রি করতে হচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। অন্যদিকে ৬০০ টাকা ক্যানের বরফ কিনে কিছু মাছ বিক্রি করেছি, তার দাম পড়েছে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা দরে।

জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং দেওয়া হয় পাথরঘাটা উপজেলায়। অথচ এই উপজেলার প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ মৎস্য পেশায় জড়িত।

বরফ মিল মালিকরা জানান, এক ক্যান পরিপক্ব বরফ উৎপাদন করতে ১৬ থেকে ১৭ ঘণ্টা মিল চালু রাখতে হয়। মিল মালিকরা বলছেন, ২৪ ঘণ্টায় একটানা সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় ২ থেকে ৩ ঘণ্টা। যার কারণে ব্যাহত হচ্ছে পরিপক্ব বরফ উৎপাদন। তাই বেশিরভাগ বরফ উৎপাদন হচ্ছে নিম্নমানের।

পাথরঘাটা আইস ফ্যাক্টরির পরিচালক তারেক হাসান বলেন, অতিরিক্ত মূল্যে বরফ বিক্রি করছি না। বিদ্যুৎ থাকে না বললেই চলে। তাই দাম কিছুটা বেশি।

বলেশ্বর আইস ফ্যাক্টরির ম্যানেজার মামুন বলেন, দিনে ৩/৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাচ্ছি। তাই এক ক্যান বরফ উৎপাদন করতে খরচ হচ্ছে অনেক বেশি। আমরা বাধ্য হয়ে কিছুটা বেশি দামে বিক্রি করছি। বেশি দামে বিক্রি মানেই বেশি ব্যবসা নয়। খরচ বেশি, তাই দাম বেশি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, বরফকল মালিকদের সিন্ডিকেটের কারণে ২০০ টাকার বরফ ৬০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এতে ট্রলার মালিক ও জেলেরা ধ্বংসের মুখে পড়ছেন। অনেকে ট্রলার ব্যবসা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। প্রতি বছর ইলিশ মৌসুমের শেষের দিকে এমন সিন্ডিকেট করে মিল মালিকরা।

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পাথরঘাটা জোনাল অফিসের ডিজিএম আরিফ শাহরিয়ার ফাহাদ বলেন, পাথরঘাটায় প্রতিদিন বিদ্যুতের ১৪ মেগাওয়াট চাহিদার অনুকূলে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় সাড়ে ৫ মেগাওয়াট। তাই লোডশেডিং দিতে বাধ্য হচ্ছি।

তবে বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন বলেন, অতিরিক্ত দামে বরফ বিক্রির অভিযোগ পেয়েছি। বরফ মিলগুলো যাতে চড়া দামে বরফ বিক্রি করতে না পারে, সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ইলিশের গুরুত্ব বিবেচনায় পাথরঘাটা উপজেলাকে জরুরি বিদ্যুতের তালিকায় নিয়ে আসার জন্য বিদ্যুৎ বিভাগকে চিঠি দিয়েছেন তিনি।

দেশে ইলিশ সম্পদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে মা ইলিশের নিরাপদ প্রজননের জন্য আগামী ৮ অক্টোবর থেকে ২২ দিন নদী ও সাগরে সব ধরনের মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে সরকার।