জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস/চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩৪ মাসে ঝরল ১৫০ প্রাণ, মিলছে না নতুন আইনের সুফল

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ও অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু রোধে জরিমানাসহ কঠোর শাস্তির বিধান রেখে প্রণীত ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ কার্যকর রয়েছে প্রায় সাত বছর ধরে। তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জে এই আইনের সুফল মিলছে না বললেই চলে। সরকারি খাতা-কলমে আইন জোরালো হলেও বাস্তবে প্রয়োগ একেবারেই ঢিলেঢালা। চালক ও পথচারীদের আইন অমান্যের মানসিকতা, তদারকির অভাব, বেপরোয়া গতি এবং ফিটনেসবিহীন ও অবৈধ যানবাহনের অবাধ চলাচলে জেলার সড়ক-মহাসড়কগুলো এখন একেকটি ভয়াবহ ‘মৃত্যুফাঁদে’ পরিণত হয়েছে। চলমান পরিস্থিতিতে ‘নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানকে সামনে রেখে আজ বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) জেলায় পালিত হচ্ছে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস।
আইনে পরিষ্কার বলা হয়েছে, বৈধ লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো এবং ফিটনেস সনদ ছাড়া যানবাহন রাস্তায় নামানো বড় অপরাধ। এছাড়া মহাসড়কে নির্দিষ্ট গতিসীমা মেনে চলা, বিপজ্জনক ওভারটেকিং বন্ধ রাখা এবং মোটরসাইকেল আরোহীদের হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক করার স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। তবে বাস্তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহাসড়ক থেকে শুরু করে গ্রামের অলিগলি সবখানেই নিয়ম ভাঙার মহোৎসব চলছে।
মহাসড়কে অবাধে নামছে ফিটনেসবিহীন ভটভটি, নসিমন ও অদক্ষ চালকের অটোরিকশা। সোনামসজিদ স্থলবন্দর রুটে পাথর ও পণ্যবাহী ট্রাকের বেপরোয়া যাতায়াত এবং ওভারটেকিং নিত্যদিনের চিত্রে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে উঠতি বয়সের কিশোরেরা কোনো ট্রাফিক নিয়ম বা হেলমেটের তোয়াক্কা না করে মোটরসাইকেল নিয়ে মেতে উঠছে গতির বিপজ্জনক প্রতিযোগিতায়।
অভিযোগ রয়েছে, জেলার ট্রাফিক পুলিশের চোখের সামনে দিয়েই একের পর এক অবৈধ ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন বিপজ্জনকভাবে চলাচল করলেও সেগুলোকে ধরে আইনের আওতায় আনার দৃশ্য খুব একটা চোখে পড়ে না। এছাড়া জেলায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাগুলোর রুট পারমিট না থাকলেও সড়কে দাপিয়ে বেড়ায় এ যানগুলো। অনেক সময় পুলিশ সদস্যদের অটোরিকশায় বসেই বিভিন্ন এলাকায় টহলও দিতে দেখা গেছে।

৩৪ মাসে সড়কে ঝরেছে ১৫০ প্রাণ
চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহাসড়ক ও গ্রামীণ সড়কে প্রতিদিনের দুর্ঘটনায় অকালে ঝরছে প্রাণ, পঙ্গুত্ব বরণ করছেন অনেকেই। জেলা পুলিশ ও বিভিন্ন সূত্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৮৮ জন, ২০২৫ সালে ৪০ জন এবং চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ২২ জনসহ গত ৩৪ মাসে জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় ১৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের বেশির ভাগই মোটরসাইকেল আরোহী।
আইন অমান্যের কারণেই ঘটছে এসব মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। চলতি বছরের ১৮ আগস্ট একদিনেই পৃথক দুর্ঘটনায় প্রাণ যান ৫ জন; যার মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-সোনামসজিদ মহাসড়কে গতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পেরে দুটি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা যান ৪ জন।
এর আগে গত ১ অক্টোবর রাতে শিবগঞ্জের কানসাট-চৌডালা সড়কে নাচোল থেকে গরু বিক্রি করে ভটভটিতে ফেরার পথে গাড়ি খাদে উল্টে বাবা-ছেলেসহ ৩ জন নিহত ও ৫ জন আহত হন। সবশেষ গত বুধবার (২১ অক্টোবর) একই উপজেলায় গরুবোঝাই ভটভটি উল্টে মারাত্মক আহত দুজন বর্তমানে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
নিয়ম ভেঙে সড়কে অদক্ষ চালক
চাঁপাইনবাবগঞ্জে কোনো প্রকার নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে যত্রতত্র গড়ে উঠেছে বেসরকারি ড্রাইভিং ট্রেনিং স্কুল। নামমাত্র প্রশিক্ষণে ট্রাফিক আইন ও কারিগরি জ্ঞান ছাড়াই টাকার বিনিময়ে অদক্ষ চালক তৈরির মহোৎসবে মেতেছে এসব প্রতিষ্ঠান। বিআরটিএ অফিস সূত্রে জানা গেছে, সরকারি দুটি প্রতিষ্ঠান (টিটিসি ও যুব উন্নয়ন) ছাড়া জেলায় অন্য কোনো বেসরকারি ড্রাইভিং ট্রেনিংয়ের বৈধ অনুমোদন নেই। অথচ নামে-বেনামে অন্তত ৩০টি ড্রাইভিং ট্রেনিং স্কুল কার্যক্রম চালাচ্ছে।
সরকারি নীতিমালায় ৩০ দিনের প্রশিক্ষণ ও তাত্ত্বিক ক্লাসের মাধ্যমে ট্রাফিক সাইন, সিগন্যাল ও ডাবল ব্রেক সম্বলিত গাড়ির ব্যবহারের নির্দেশ থাকলেও বাস্তবে দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৭ থেকে ১৫ দিনের অসম্পূর্ণ প্রশিক্ষণ। ইঞ্জিন রক্ষণাবেক্ষণ, ব্রেক ফেল বা জরুরি কারিগরি বিষয়ে প্রশিক্ষণ না থাকায় কেবল স্টিয়ারিং ঘোরাতে শেখা এসব অদক্ষ চালকের কারণে সড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি চরম মাত্রায় পৌঁছাচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরএলাকার চরাগ্রামের বাসিন্দা ভুক্তভোগী মারেফুল ইসলাম জানান, ৩০ দিনের ক্লাসের কথা বলে ভর্তি করা হলেও মাত্র ৭-১০ দিন গাড়ি ধরা শিখিয়েই কোর্স শেষ দাবি করা হয়। ট্রাফিক সিগন্যাল বা আইন নিয়ে কোনো ক্লাসই নেওয়া হয়নি।

গ্রামীণ সড়কে অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গ্রামীণ সড়কগুলোতে কোনো প্রকার নিয়ন্ত্রণের তোয়াক্কা না করে ব্যাটারিচালিত ভ্যান নিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকেরা। কেউ পরিবারের আর্থিক অভাব মেটাতে আবার কেউ পড়ালেখা ছেড়ে চালকের আসনে বসেছে। তবে সড়ক শৃঙ্খলা ও ট্রাফিক নিয়ম সম্পর্কিত ন্যূনতম ধারণা না থাকায় অনভিজ্ঞ এই শিশুদের কারণে অহরহ ঘটছে মারাত্মক দুর্ঘটনা, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের চরম নিরাপত্তার ঝুঁকিতে ফেলছে।
অভিভাবকদের অসচেতনতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঢিলেঢালা মনিটরিংয়ের সুযোগেই শিশুরা অদক্ষ হাতে যানবাহন নিয়ে পিচঢালা পথে নেমে পড়ছে। সামান্য অনবধানতায় অকালে ঝরে যাচ্ছে তাজা প্রাণ, পঙ্গুত্ব বরণ করছে পথচারী ও যাত্রীরা।
এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে শিবগঞ্জের শাহবাজপুরের বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, অপ্রাপ্তবয়স্কদের হাতে যানবাহন তুলে দেওয়া মারাত্মক অপরাধ। তাদের সড়ক নিয়ম বা গতি নিয়ন্ত্রণের সচেতনতা থাকে না। অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের এসব ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে বিরত রাখা, না হলে সড়কের এই অকাল মৃত্যু কোনোভাবেই থামানো যাবে না।
সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ কারণ চিহ্নিত
চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রতিদিনই ঘটছে ছোট-বড় নানা সড়ক দুর্ঘটনা, যার ফলে ঝরছে অসংখ্য প্রাণ আর পঙ্গুত্ব বরণ করছেন অনেকে। জেলায় দুর্ঘটনার এই ভয়াবহ পরিস্থিতির পেছনে ৫টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা) চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কমিটি।
সংগঠনটির জেলা কমিটির দুর্ঘটনা অনুসন্ধান ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক মেহেদি হাসানের মতে, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিনিয়ত বাড়ার পেছনে মূল কারণগুলোর মধ্যে প্রথমেই রয়েছে চালকদের নেশাগ্রস্ত অবস্থায় যানবাহন চালানো। পাশাপাশি প্রয়োজনের তুলনায় জেলার সড়কগুলো অপ্রশস্ত হওয়াকেও তিনি বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। এ ছাড়া গাড়ি চালানো অবস্থায় চালকদের অসচেতনতা, ড্রাইভিং চলাকালে ঝিমুনি ধরা ও মুঠোফোনে কথা বলা, সড়ক পরিবহন আইনের বাস্তব প্রয়োগহীনতা এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ বা ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে ট্রাফিক পুলিশের পর্যাপ্ত তদারকি না থাকাকে দায়ী করেন তিনি।
মেহেদি হাসান জানান, মূলত সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতা ও এসব অব্যবস্থাপনার কারণেই জেলার সড়কগুলোতে অকালমৃত্যু ও পঙ্গুত্বের মিছিল থামছে না। তাই সড়ককে দ্রুত নিরাপদ করতে অবিলম্বে আইনের কঠোর প্রয়োগ ও ট্রাফিক তদারকি বাড়ানোর জোর দাবি জানান তিনি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরএলাকার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন জানান, অনেক শিক্ষার্থী নিয়ম না মেনে বাইক নিয়ে স্কুলে আসে এবং তাদের মধ্যে গতি দেখানোর প্রবণতা বেশি। তাদের নিষেধ করা হলেও, তারা শুনে না।
অভিভাবক আসজাদুর রহমান মনে করেন, কম বয়সে সন্তানদের হাতে বাইক তুলে দিয়ে মা-বাবারাও বড় ভুল করছেন। বয়স না হওয়ার আগে সন্তানদের হাতে মোটরসাইকেল তুলে দেয়া ঠিক নয়। এজন্য অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সাবেক সভাপতি সাদ হোসেন মুজাহিদ বলেন, জেলায় সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে প্রথমেই সড়ক পরিবহন আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি চালকদের সঠিক প্রশিক্ষণ প্রদান, যানবাহনের বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণ এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল বন্ধ করা জরুরি। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ট্রাফিক লেন নির্ধারণ ও তা বাস্তবায়ন, অটোরিকশা ও থ্রি-হুইলারের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল রোধ, যত্রতত্র পার্কিং বন্ধ এবং ট্রাফিক আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সর্বোপরি চালক, যাত্রী ও পথচারীদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সমন্বিত সড়ক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই একটি নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা সম্ভব।
সড়কে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার মূল কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ইনচার্জ মাহতাব উদ্দিন জানান, অবৈধ যানবাহনের ছড়াছড়ি, যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত গতি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত মনিটরিংয়ের অভাবই মূলত সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ার প্রধান কারণ। তিনি বলেন, গুরুত্ব বিবেচনা করে আঞ্চলিক মহাসড়কগুলোতে দ্রুত হাইওয়ে পুলিশের প্রশাসনিক ও তদারকিমূলক কার্যক্রম চালু করা প্রয়োজন। নিয়মিত টহল ও তদারকি থাকলে দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
নিয়ম ভেঙে গড়ে ওঠা অবৈধ ড্রাইভিং ট্রেনিং স্কুল এবং অদক্ষ চালক তৈরির বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ বিআরটিএর সহকারী পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মো. শাহজামাল হক বলেন, জেলায় টিটিসি ও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ছাড়া আর কোনো বেসরকারি ড্রাইভিং স্কুলের বৈধ অনুমোদন নেই। এসব অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানে মানসম্মত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে না, যা সড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তিনি আরও জানান, অবৈধ স্কুলগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে এবং ইতোমধ্যে একটি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছে। একই সঙ্গে ভুয়া প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতারিত না হয়ে অনুমোদিত কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ নিতে সাধারণ মানুষকে আহ্বান জানান তিনি।
সড়ক দুর্ঘটনা রোধ ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো প্রসঙ্গে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এ.এন.এম. ওয়াসিম ফিরোজ বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা কমানো কেবল একক কোনো সংস্থার পক্ষে সম্ভব নয়। এজন্য চালক, গাড়ি মালিক এবং পথচারী সবারই সমান দায়িত্ব রয়েছে। সড়কে ট্রাফিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হয়ে ট্রাফিক আইন মেনে চললে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব।


