logo

শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে স্বাবলম্বী বায়েজিদ, পথ দেখাচ্ছেন অন্যদেরও

শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে স্বাবলম্বী বায়েজিদ, পথ দেখাচ্ছেন অন্যদেরও
শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে নিজের পায়ে দাঁড়ানো মোহাম্মদ বায়েজিদ হাসান। ছবি: এশিয়া পোস্ট

জন্মগত শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও চাকরি না পাওয়ার হতাশা কোনোটিই দমিয়ে রাখতে পারেনি মোহাম্মদ বায়েজিদ হাসানকে। মানুষের করুণার ওপর নির্ভর না করে নিজের মেধা, শ্রম ও ইচ্ছাশক্তিতে গড়ে তুলেছেন কর্মসংস্থান। কম্পিউটারের কাজ করে জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি সংসারের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি অন্যদেরও কম্পিউটারের কাজ শিখিয়ে কর্মসংস্থানের পথ দেখিয়েছেন তিনি।

বায়েজিদ হাসানের বাড়ি সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কামালনগর গ্রামে। জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বেড়ে ওঠা তার। শৈশবে দুই পায়ের গঠন স্বাভাবিক ছিল না। ছয় বছর বয়সে ঢাকার পিজি হাসপাতালে তার দুই পায়ে অস্ত্রোপচার করা হয়। দীর্ঘ অনুশীলনের পর লাঠির সাহায্যে হাঁটতে শেখেন তিনি।

বায়েজিদের মা ফরিদা রহমান ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে কখনো হাল ছাড়েননি। সমাজের নানা কথা উপেক্ষা করে ছেলেকে শিক্ষিত করার উদ্যোগ নেন তিনি। ফরিদা রহমান বলেন, মানুষ বলত, ছেলে প্রতিবন্ধী, তাকে লেখাপড়া করিয়ে কী হবে? আমি বলতাম, তবুও সে সমাজের একজন হবে, তার একটা পরিচয় থাকবে। আমি কখনো চাইনি আমার ছেলে রাস্তায় বসে মানুষের কাছে হাত পাতুক। আমি চেয়েছি, সে লেখাপড়া শিখে নিজের পায়ে দাঁড়াক।

মায়ের সেই স্বপ্ন পূরণে লেখাপড়া চালিয়ে যান বায়েজিদ। ১৯৯৭ সালে সাতক্ষীরা পিএন হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করেন তিনি। পরে উচ্চমাধ্যমিক, সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ থেকে বাংলায় অনার্স এবং খুলনার বিএল কলেজ থেকে ২০০৬ সালে বাংলায় স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। উচ্চশিক্ষা শেষ করে একাধিকবার চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিলেও শেষ পর্যন্ত চাকরি পাননি।

এরপর ২০০৮ সালে শুরু করেন কম্পিউটারের ব্যবসা। বর্তমানে তার দোকানে ই-জিপি ও ই-টেন্ডার, পাসপোর্ট ও ভিসা-সংক্রান্ত কাজ এবং বিভিন্ন সরকারি চাকরির আবেদন পূরণসহ নানা ধরনের কম্পিউটার সেবা দেওয়া হয়। এই আয়েই চলে তার সংসার। ২০০৯ সালে বাবাকে হারানোর পর পরিবারের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে তার সংসার।

বায়েজিদ হাসান বলেন, আমার জীবন-জীবিকা সম্পূর্ণভাবে এই কম্পিউটারের দোকানের ওপর নির্ভরশীল। এই কাজের আয় দিয়েই আমার সংসার চলে। আমি আমার দুই বন্ধুকে কম্পিউটারের কাজ শিখিয়েছি। তারা এখন এই কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে। আমার জীবনের অর্জনের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান আমার মা ও পরিবারের।

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আব্দুর রহমান সিদ্দিক বলেন, বায়েজিদ দক্ষতার সঙ্গে কম্পিউটারের কাজ করেন। ব্যক্তিগত বিভিন্ন কাজে তিনি তার কাছে যান। নিজের পরিশ্রমে সংসার চালানো বায়েজিদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করেন তিনি।

সমাজকর্মী শেখ মমতাজ আহমেদ বলেন, প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও বায়েজিদ লেখাপড়া শিখে কম্পিউটারের কাজের মাধ্যমে নিজের কর্মসংস্থান তৈরি করেছেন। তার এই উদ্যোগ সমাজের জন্য অনুকরণীয়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান ও স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরিতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর এগিয়ে আসা উচিত।

পাশের দোকানের কর্মচারী প্রান্ত সরকার বায়েজিদের ব্যবহার ও আচরণের প্রশংসা করে বলেন, মানুষের সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার ও কাজের প্রতি আন্তরিকতাই বায়েজিদকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।

বায়েজিদ প্রতিবন্ধী শিশুদের পরিবারকে তাদের সন্তানদের লেখাপড়া শেখানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে সরকারের কাছে প্রতিবন্ধী শিশু ও তরুণদের প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির অনুরোধ জানান তিনি।