চাঁদাবাজির অভিযোগে সেই জামায়াত নেতাসহ ২৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা

সাতক্ষীরার শ্যামনগরে চাঁদাবাজির অভিযোগে জামায়াত নেতা হাজী মো. নজরুল ইসলামসহ ২৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পে চাঁদা দাবির অভিযোগে এ মামলা করা হয়। রোববার (২৪ মে) রাতে শ্যামনগর থানায় মামলাটি করেন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান আর-রাদ করপোরেশনের আইন কর্মকর্তা মো. জালাল উদ্দিন।
মামলার প্রধান আসামি বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী মো. নজরুল ইসলাম। তিনি শ্যামনগর উপজেলা জামায়াতের কর্মপরিষদ ও শুরা সদস্য। তার ছেলে আব্দুর রহমান ও স্থানীয় বিশ্বজিৎ মণ্ডলকেও আসামি করা হয়েছে। অজ্ঞাতনামা আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়।
জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয় শ্যামনগরের পূর্ব দুর্গাবাটি এলাকায়। খোলপেটুয়া, মালঞ্চ ও কালিন্দী নদীর তীররক্ষা ও বাঁধ সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কাজটি বাস্তবায়ন করছে ডিএল-উন্নয়ন (জেভি) ও ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড। মাঠপর্যায়ে দায়িত্বে রয়েছে আর-রাদ করপোরেশন।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত বছরের আগস্ট থেকে চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের কাছে চাঁদা দাবি করে আসছিলেন। কাজ বন্ধ রাখতেও চাপ দিচ্ছিলেন। চাঁদা না পাওয়ায় গত ১৪ এপ্রিল থেকে প্রকল্পের কাজ থমকে যায়।
একপর্যায়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে বিষয়টি পুলিশ সুপারকে জানানো হলে আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে অভিযুক্তরা। গত ১৯ মে রাতে চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম প্রকল্প এলাকায় গিয়ে ১৫ লাখ টাকা দাবি করেন। কাজ চালিয়ে গেলে তিনি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হত্যার হুমকি দেন বলেও মামলায় অভিযোগ করা হয়।

এর আগে গত ১৩ মে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া ইউপি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। এতে নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে কাজটি বন্ধ করতে চাপ সৃষ্টি, প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দায়িত্বরত প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়া, শ্রমিকদের ভয় দেখানো এবং বড় অঙ্কের চাঁদা দাবির অভিযোগ করা হয়।
প্রকৌশলীকে মারধর
গত ২৩ মে পরিস্থিতি সহিংস রূপ নেয়। চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম, তার ছেলে আব্দুর রহমান ও স্থানীয় কয়েকজন মোটরসাইকেল বহর নিয়ে প্রকল্প এলাকায় হাজির হন। মামলার অভিযোগে বলা হয়, এ সময় প্রকৌশলী জাহিদ হাসানকে মারধর করা হয়। বাধা দিতে এগিয়ে আসা কিউরিং ম্যান ফেরদৌসকেও মারধর করা হয়। প্রকৌশলী জাহিদের হাত থেকে একটি অ্যাপল আল্ট্রা স্মার্টওয়াচ ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
মামলার বাদী জানান, পুরো ঘটনা সিসি ক্যামেরায় ধারণ হয়েছে। আহত জাহিদ হাসান ও ফেরদৌস এখন শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন।
বর্ষার আগে কাজ শেষ না হলে বিপদ
হামলার পর থেকে নিরাপত্তাহীনতায় প্রকল্পের কাজ বন্ধ। সেখানে রাখা কোটি টাকার যন্ত্রপাতিও ঝুঁকিতে রয়েছে। আর-রাদ করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সবুজ আলী খান বলেন, ‘বর্ষার আগে কাজ শেষ করা না গেলে পুরো উপকূলীয় এলাকা ঝুঁকির মুখে পড়বে। অথচ বারবার বাধা ও হুমকির কারণে কাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, বর্ষার আগে বাঁধ নির্মাণ শেষ না হলে উপকূলীয় বিস্তীর্ণ এলাকা নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকিতে পড়বে। আন্তর্জাতিক অর্থায়নের এই প্রকল্প বাধাগ্রস্ত হলে দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
নিজের বিরুদ্ধে উত্থাপিত সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন হাজী মো. নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আর যেদিন হামলার অভিযোগ আনা হয়েছে, ওই সময় আমি ইউনিয়ন পরিষদের বাজেট অধিবেশনে ছিলাম।’
সাতক্ষীরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আমিনুর রহমান বলেন, ‘সম্প্রতি পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে একটি অভিযোগ পাওয়া যায়। এর কয়েক দিন পর আবারও প্রকল্প এলাকায় অভিযুক্ত ব্যক্তি ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে হামলা ও মারধরের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় একটি মামলা দায়ের হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘পুলিশ আসামিদের গ্রেপ্তারে তৎপর রয়েছে। আশা করি, দ্রুত অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি সরকারের চলমান এই প্রকল্প যাতে নির্বিঘ্নে বাস্তবায়ন করা যায়, সে ব্যাপারেও পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।’
