Advertisement

বরিশাল/কোটি মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় ১০০০ চিকিৎসক

শাকিল মাহমুদ, বরিশাল
কোটি মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় ১০০০ চিকিৎসক
বরিশাল শহর। ছবি: এশিয়া পোস্ট

তীব্র চিকিৎসক সংকটে বরিশাল বিভাগের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কার্যত ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। বিভাগের ছয় জেলায় সরকারি হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে চিকিৎসকের অনুমোদিত দুই হাজার ৪৩৮টি পদের মধ্যে ১ হাজার ৪৩২টিই শূন্য। অর্থাৎ এক হাজার ছয়জন চিকিৎসক দিয়ে চলছে বিভাগের কোটি মানুষের স্বাস্থ্যসেবা।

Advertisement

বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (শেবাচিম) বাদে বিভাগের ছয় জেলায় চিকিৎসকের ৬৪ শতাংশ পদই খালি। এক হাজার ৮৬৭টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে মাত্র ৬৭১ জন চিকিৎসক কর্মরত আছেন। এরমধ্যে ভোলায় ৩৮৩টি পদের বিপরীতে ১০৩ জন, বরগুনায় ২১৭টির জায়গায় ৭৪ জন, ঝালকাঠিতে ২০০টির জায়গায় ৫৮ জন, পিরোজপুরে ২৯৫টির জায়গায় ৯২ জন, পটুয়াখালীতে ৩৩৩টির জায়গায় ১২০ জন এবং বরিশাল জেলায় ৪৩৯টি পদের বিপরীতে ২২৪ জন চিকিৎসক কাজ করছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, নদীবেষ্টিত ও দুর্গম উপজেলাগুলোতে চিকিৎসক ধরে রাখা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নিয়মিত পদায়ন ও নিয়োগ দেওয়া হলেও অনেক চিকিৎসক বিভিন্ন উপায়ে বদলি নিয়ে চলে যান। কেউ দীর্ঘ ছুটিতে থাকেন, আবার কেউ অন্য কর্মস্থলে দায়িত্ব নিয়ে চলে যান। ফলে কাগজে-কলমে পদ থাকলেও বাস্তবে অনেক হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক পাওয়া যায় না। এর সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হন চরাঞ্চল ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ।

এদিকে উপজেলা পর্যায়ে সেবা না পেয়ে রোগীরা ভিড় করছেন অঞ্চলের সর্ববৃহৎ চিকিৎসাকেন্দ্র শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এক হাজার শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন দুই হাজার ভর্তি রোগী ও বহির্বিভাগে আরও ২ হাজারের বেশি মানুষ সেবা নিতে আসেন। তবে সেখানেও চিকিৎসকের ৫৭১টি পদের মধ্যে ২৪০টিই খালি—যার মধ্যে ২৪৮টি বিশেষজ্ঞ পদের ১৪৬টি এবং ৩২৩টি সাধারণ চিকিৎসক পদের ৯৪টি পদ শূন্য। ফলে চিকিৎসকদের ওপর অতিরিক্ত কর্মচাপ তৈরি হচ্ছে এবং রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মশিউল মুনীর বলেন, প্রতিদিন যে পরিমাণ রোগী হাসপাতালে আসেন, সে তুলনায় চিকিৎসক অত্যন্ত কম। তা সত্ত্বেও বিদ্যমান জনবল দিয়েই সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর বরিশাল নগর সম্পাদক মো. রফিকুল আলম বলেন, বরিশালের চিকিৎসক সংকট কেবল জনবলস্বল্পতার বিষয় নয়; এটি দীর্ঘদিনের সুপরিকল্পনার ঘাটতি, দুর্গম এলাকায় চিকিৎসকদের ধরে রাখতে ব্যর্থতা এবং কার্যকর তদারকির দুর্বলতারও প্রতিফলন। বছরের পর বছর উপজেলা হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত চিকিৎসক নিশ্চিত করতে না পারায় সাধারণ মানুষ সরাসরি বিভাগীয় হাসপাতালে চলে আসছেন। ফলে যে রোগের চিকিৎসা উপজেলা পর্যায়েই হওয়া সম্ভব, সেটিও এখন বিভাগীয় হাসপাতালের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

তিনি আরও বলেন, দুর্গম উপজেলায় কর্মরত চিকিৎসকদের জন্য নিরাপদ আবাসন, দ্রুত পদোন্নতি ও বাধ্যতামূলক কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে না পারলে এই সংকট কাটবে না। অন্যথায় দক্ষিণাঞ্চলের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এই সংকট আরও ঘনীভূত হবে এবং এর সবচেয়ে বড় খেসারত দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই।

বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. রেফায়েতুল হায়দার বলেন, অনুমোদিত পদের তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা খুবই কম। এর পাশাপাশি তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদেরও প্রায় ৫০ শতাংশ পদ শূন্য রয়েছে। সব মিলিয়ে রোগীর অতিরিক্ত চাপ সামলে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিষয়টি ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। নতুন নিয়োগের মাধ্যমে সংকট কিছুটা লাঘব হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, চিকিৎসক সংকটের মধ্যেও ২ হাজার ৯১০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে ২ হাজার ৭৪৫ জন সিনিয়র স্টাফ নার্স কর্মরত থাকায় অনেক সেবা কার্যক্রম এখনো সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে।

বিষয় :