থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পেটানোর অভিযোগ

রংপুর মহানগরীতে থানার ভেতরেই এক সেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করার অভিযোগ উঠেছে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তিন পুলিশ সদস্যকে ক্লোজড করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বুধবার (৩ জুন) রাত সাড়ে ৯টার দিকে নগরীর কোতয়ালী থানার ভেতরে এ ঘটনা ঘটেছে।
মারধরের শিকার ওই নেতার নাম রাকিবুল ইসলাম। তিনি সদর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব।
মারধরের শিকার নেতা রাকিবুল ইসলাম দাবি করেছেন, থানার ভেতরে ওসি আজাদ রহমানের নেতৃত্বে কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাকে মারধর করেন।
ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, ঈদের আগে নগরীর সিও বাজার এলাকার এক প্রেমিক যুগল নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল। ওই যুগলকে উদ্ধারের পর বুধবার সন্ধ্যায় কোতয়ালী থানায় আনা হয়। ওই যুগলের পরিবারের অনুরোধে বিষয়টি মীমাংসা করতে স্বেচ্ছাসেবক দলের কয়েকজন নেতা থানায় যান। লাভলু নামে এক নেতার ডাকে থানায় যান নেতা রাকিবুল ইসলাম।
অভিযোগ রয়েছে, থানায় গিয়ে রাকিবুল ইসলাম দেখতে পান, এক পুলিশ সদস্য ওই যুগলকে মারধর করছেন। তিনি বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানালে ওসি ও কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাকে মারধর করেন। এতে তিনি রক্তাক্ত ও আহত হন। ঘটনার খবর পেয়ে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা থানার সামনে জড়ো হন। একপর্যায়ে থানার কলাপসিবল গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ সময় গেটের ভেতর থেকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন রাকিবুল ইসলাম। তখন তার শরীরে রক্তের দাগ ও আঘাতে একটি চোখ ফুলে থাকতে দেখা যায়।
এ সময় রাকিবুল ইসলাম অভিযোগ করেন, উদ্ধার করা প্রেমিক যুগলকে থানার ভেতরে এক পুলিশ সদস্য মারধর করছিলেন। বিষয়টি দলের এক নেতাকে জানাতে তিনি ফোন করতে গেলে ওসি, উপপরিদর্শক (এসআই) ও কয়েকজন পুলিশ সদস্য তার ওপর চড়াও হন। পরে তাকে বেধড়ক মারধর করা হয়।
এ সময় কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, এখানে ওসি, এসআই আমাকে রাইফেল দিয়ে মারলো। বারবার তাদের অনুরোধ করেছি, পরিচয় দিয়েছি যে আমি স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব, বিএনপির একজন কর্মী। তারপরেও আমরা তারা আমাকে মেরে চোখটা কীরকম করল, মাথায় দুই জায়গায় মারছে। বন্দুক দিয়ে মারছে। আমার ফোন দুইটা কেড়ে নিয়েছে। পুলিশের চরিত্র এখনো ফ্যাসিবাদীর মত রয়েছে। আমি এর ন্যায্য বিচার চাই।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, মারধরের পর পুলিশ সদস্যরা তাকে জোর করে নিয়ে গিয়ে শরীরে লেগে থাকা রক্ত ধুয়ে দেন। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের সামনে রক্তমাখা তুলা দেখান এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানের আঘাতের চিহ্ন দেখান।
খবর পেয়ে থানায় যান মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক শামসুজ্জামান সামু। পরে মারধরের শিকার ওই নেতাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে রাত ১১ টার দিকে থানা থেকে ওই যুগলকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ সময় থানার ভেতরে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সদর উপজেলার হরিদেবপুর ইউনিয়ন বিএনপির নেতা জাহাঙ্গীর আলম সাংবাদিকদের বলেন, রাকিবকে পুলিশেরা ধরে মারলো, আমারও মাথায় ঘুসি তুলছিল। ওই যে বাচ্চা দুইটাকে ধরে মারছে ও গিয়ে নিষেধ করল এজন্য।
এ সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীরা অন্যরা জানান, ওসি নিজেই স্বেচ্ছাসেবক দল রাকিবুলকে নেতাকে পিটিয়েছে। এ সময় সাংবাদিকদের সাথে কথা না বলতে উপস্থিত নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেন সামসুজ্জামান সামু।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে কোতয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজাদ রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি মারধরের বিষয়টি অস্বীকার করেন। এ সময় তিনি বলেন, উদ্ধার হওয়া প্রেমিক যুগলের দুই পরিবারের মধ্যে হাতাহাতি হলে তারা থামান।
শরীরে আঘাতের চিহ্ন ও কাপড়ে রক্তের দাগ নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ভাই, অনেক সময় আম ছিলতে গিয়েও তো রক্ত বের হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, এরকম অভিযোগ পেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে দিবাগত রাতে (২টা ২২ মিনিট) রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া সেল থেকে জানানো হয়, এ ঘটনায় তিন পুলিশ সদস্যকে পুলিশ লাইন্সে রিপোর্ট (ক্লোজড) করার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। তারা হলেন ঘটনার সময় দায়িত্বে থাকা নারী কনস্টেবল লিমা সরেন, ডিউটি অফিসার মেহেরুন্নেসা ও সাব-ইন্সপেক্টর মাসুদ রানা।
একইসঙ্গে এ ঘটনার প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটনের লক্ষ্যে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন ও অর্থ) নরেশ চাকমাকে সভাপতি, ডিসি (ক্রাইম) মো. মাহফুজুর রহমান এবং এসি কোতোয়ালি সুকুমার রায়কে সদস্য করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটি বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় আইনানুগ ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এ জন্য সবাইকে ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করতে অনুরোধ করা হয়েছে।
