ডেঙ্গুর ‘হটস্পট’ পিরোজপুর, আট মাসে আক্রান্ত ১৮৫৯

পিরোজপুরে ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। চলতি বছরের গত আট মাসে জেলার সদর হাসপাতালসহ সাতটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৮৫৯ জন। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্তের এই সংখ্যা শুধু বরিশাল বিভাগের মধ্যে নয়, বর্তমানে সারাদেশের মধ্যেও সর্বোচ্চ।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৮৫ জন। এ পর্যন্ত চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ হাজার ৭৭৩ জন। জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত একজনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, বর্তমানে পিরোজপুর সদর হাসপাতালে ৩৯ জন, নাজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৪ জন, নেছারাবাদে ১৫ জন, কাউখালীতে ১ জন, ভান্ডারিয়ায় ১৫ জন এবং মঠবাড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তবে জিয়ানগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে কোনো ডেঙ্গু রোগী ভর্তি নেই।
ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ রোগী ও স্বজনদের মধ্যেও চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। হাসপাতালের জায়গা স্বল্পতার কারণে ডেঙ্গু রোগীদের সাধারণ রোগীদের কাছাকাছি অবস্থান করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা। এতে অন্যান্য রোগীদের মধ্যে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য দ্রুত পৃথক ওয়ার্ড বা কক্ষের ব্যবস্থা করার জোর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
হাওয়া বেগম নামে এক ডেঙ্গু রোগী বলেন, হঠাৎ জ্বর আসার পর আমার পেট ফুলে যায়। পরে হাসপাতালে এসে পরীক্ষা করানোর পর ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ খাচ্ছি, তবে শারীরিক উপসর্গগুলো এখনো পুরোপুরি কমেনি।
মো. কাওসার নামে এক রোগীর স্বজন বলেন, আমার স্ত্রীর ভাগ্নি অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। টেস্ট পরীক্ষা চলাকালেই তার শরীরে জ্বর আসে। তাকে হাসপাতালে নিয়ে এলে চিকিৎসক কিছু পরীক্ষা দেন। হাসপাতালে সুবিধা না থাকায় বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে পরীক্ষাগুলো করাতে হয়েছে। রিপোর্ট দেখে চিকিৎসক জানান তার ডেঙ্গু হয়েছে। এর ফলে মেয়েটি তিনটি পরীক্ষা দিতে পারেনি। বর্তমানে তার বমি হচ্ছে এবং ত্বকে র্যাশ দেখা দিয়েছে। আমাদের বাড়ি বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জে হলেও কাছের হাসপাতাল হিসেবে আমরা এখানেই এসেছি।
আক্রান্ত এক রোগীর বাবা মো. মারুফ হাওলাদার বলেন, গত রোববার মেয়েকে পিরোজপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করি। পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়ে। বর্তমানে সে কিছুটা সুস্থ। তবে হাসপাতালে রোগীর অনেক ভিড়। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা করলে সবার জন্যই ভালো হতো।
রুমানা বেগম নামে অপর এক সাধারণ রোগী বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের কামড় দেওয়া মশা যদি অন্য রোগীদের কামড়ায়, তবে তারাও আক্রান্ত হতে পারে। আমি পেটে ব্যথা নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছি। সেবা ভালো পেলেও একই স্থানে ডেঙ্গু রোগীদের সঙ্গে থাকতে ভয় লাগছে। ডেঙ্গু, হাম ও সাধারণ রোগীদের জন্য আলাদা আলাদা কক্ষ থাকা প্রয়োজন।
পিরোজপুর জেলা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্থানীয় রোগীদের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী বাগেরহাট জেলার মোরেলগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকেও ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসছেন। এতে হাসপাতালটিতে রোগীর চাপ বহুগুণ বেড়ে গেছে। তবে ডেঙ্গু রোগীদের সার্বক্ষণিক চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষ মেডিকেল টিম গঠন করার পাশাপাশি জেলা হাসপাতালে একটি পৃথক ডেঙ্গু কর্নার চালু করা হয়েছে।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জানায়, বাড়িঘর ও আশপাশের জমা পানিতে এডিস মশার বংশবৃদ্ধি ঘটছে। বিশেষ করে সুপারি গাছ কাটার পর গাছের গোড়ায় বা কাটা অংশে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার প্রজনন বেশি হচ্ছে। এছাড়া বাড়ির আঙিনায় পড়ে থাকা বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা পানিও ডেঙ্গুর বাহক এই মশার বিস্তারে ভূমিকা রাখছে।
পিরোজপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মতিউর রহমান বলেন, আমরা অধিকাংশ বাড়িতে খোঁজ নিয়ে দেখেছি, সুপারি গাছ কাটার পর অবশিষ্ট গোড়ায় সহজে পানি জমে থাকে। এছাড়া বাড়ির আঙিনার বিভিন্ন অবহেলাযুক্ত পাত্রেও মশার বিস্তার ঘটছে।
তিনি আরও বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমরা সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের (স্টেকহোল্ডার) নিয়ে সচেতনতামূলক সভা করছি। পাশাপাশি হাসপাতাল এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার কার্যক্রম চলছে। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পক্ষ থেকে জনসচেতনতায় নিয়মিত লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে।



