মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত রমজানের বদলে কারাভোগ করা সোনা মিয়া মুক্ত

অপরাধ না করেও মাদক মামলায় মৃত্যুদণ্ডের আসামি হয়ে ১ মাস ২১ দিন কারাগারে কাটিয়েছেন কক্সবাজার শহরের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সোনা মিয়া। গত ২৩ জুন তাকে গ্রেপ্তারের পর তিনি জানতে পারেন, ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় তাকে পাঁচ আসামির একজন হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অথচ ওই মামলার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।
শেষ পর্যন্ত কারাগারে সংরক্ষিত তথ্য, ছবি ও পরিচয় শনাক্তের নথি যাচাই এবং পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে, মামলার আসামি হিসেবে যে সোনা মিয়াকে দেখানো হয়েছিল, তিনি প্রকৃত সোনা মিয়া নন। তার পরিচয় ব্যবহার করে মামলায় আসামি হয়েছিলেন রমজান নামের এক ব্যক্তি।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আদালতের আদেশ ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন সোনা মিয়া। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কারাগারের জেলার সুপার মো. ওবায়াদুর রহমান।
কারাগার থেকে বেরিয়ে সোনা মিয়া বলেন, আমার দ্বিতীয় জন্ম হয়েছে। রোহিঙ্গাদের বিশ্বাস ও বন্ধুত্ব করা মহাপাপের। এই পাপ যেন কেউ না করেন।
মুক্তির পর আইনজীবী, পুলিশ, গণমাধ্যমকর্মী ও কারা কর্তৃপক্ষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
সোনা মিয়া জানান, গত ২৩ জুন কক্সবাজার র্যাব-১৫-এর অভিযানে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে প্রথমে তিনি বুঝতে পারেননি, কেন তাকে আটক করা হয়েছে। পরে কক্সবাজার জেলা কারাগারে নেওয়ার পর জানতে পারেন, ইয়াবা উদ্ধারের একটি মামলায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মামলাটির বিষয়ে খোঁজ নিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, এর সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। এরপর কারাগারে থাকা অবস্থায় জেল সুপারের কাছে লিখিত আবেদন করেন তিনি।
সোনা মিয়ার আবেদনের পর কারা কর্তৃপক্ষের সংরক্ষিত তথ্য যাচাই করে ২০২০ সালে ওই মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়া এবং ২০২৬ সালে গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়ার পরিচয়, ছবি ও শারীরিক বৈশিষ্ট্যে একাধিক অমিল পাওয়া যায়। পরে বিষয়টি কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতকে লিখিতভাবে জানানো হয়। আদালতের নির্দেশে কক্সবাজার সদর থানা পুলিশ তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয়।
আদালতের নথি অনুযায়ী, ঘটনার সূত্রপাত ২০২০ সালের ২ মার্চ। ওই দিন কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। এ ঘটনায় করা মামলার এজাহারে দ্বিতীয় আসামি হিসেবে সোনা মিয়ার নাম উল্লেখ করা হয়।
এজাহারে তার বাবার নাম মৃত নজির আহমদ, বর্তমান ঠিকানা কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুবদিয়াপাড়া এবং স্থায়ী ঠিকানা রামু উপজেলার গর্জনিয়া উল্লেখ করা হয়। অভিযানের সময় ওই ব্যক্তির কাছ থেকে পাওয়া একটি জন্মনিবন্ধনের ফটোকপির সূত্রে ‘সোনা মিয়া’ নামটি ব্যবহার করা হয়েছিল বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তৎকালীন ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মানস বড়ুয়া ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন। চার্জশিটে বলা হয়, দ্বিতীয় আসামির নাম-ঠিকানা যাচাই করতে কক্সবাজার সদর ও রামু থানা-পুলিশ অনুসন্ধান চালায়। তবে অনুসন্ধানে ‘সোনা মিয়া’র দেওয়া নাম-ঠিকানা সঠিক পাওয়া যায়নি।
তদন্ত কর্মকর্তা চার্জশিটে উল্লেখ করেন, আসামির নাম-ঠিকানা সঠিক না হওয়ায় তাকে জেলহাজতে রেখে পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৩ জুন ‘সোনা মিয়া’ কক্সবাজার জেলা জজ আদালত থেকে জামিন পান। জামিনে বের হওয়ার পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওই মামলায় ‘সোনা মিয়াসহ’ পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
রায়ের পর গত ২৩ জুন র্যাব-১৫-এর একটি দল ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে কক্সবাজারের চকরিয়া থেকে সোনা মিয়াকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাকে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারে যাওয়ার পরই প্রশ্ন ওঠে, গ্রেপ্তার হওয়া এই সোনা মিয়াই কি সেই ব্যক্তি, যার বিরুদ্ধে ওই মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে?
কারাগারে যাওয়ার দুই-তিন দিন পর সোনা মিয়া জেল সুপারের কাছে আবেদন করে জানান, তিনি ওই মামলার আসামি নন। এরপর কারা কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা ২০২০ সালের তথ্যের সঙ্গে ২০২৬ সালে গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়ার তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়।
এতে ছবি, আঙুলের ছাপ, ঠিকানা, পরিবারের সদস্য, শারীরিক গঠন ও শনাক্তকরণ চিহ্নে একাধিক পার্থক্য পাওয়া যায়।
আদালতের নির্দেশে কক্সবাজার সদর থানা-পুলিশ তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয়। পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া দ্বিতীয় আসামির প্রকৃত নাম রমজান। তিনি পুলিশের কাছে নিজেকে ‘সোনা মিয়া’ হিসেবে পরিচয় দেন এবং পরে একটি জন্মনিবন্ধন কার্ড দেখান।
তদন্তে আরও জানা যায়, রমজান ও প্রকৃত সোনা মিয়া একই সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাস করতেন। পরে তারা ক্যাম্প থেকে বের হয়ে কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়াপাড়ায় দীর্ঘদিন একই ঘরে বসবাস করেন। একপর্যায়ে সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধন রমজানের কাছে ছিল। ওই জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে রমজান নিজের পরিচয় গোপন করে ‘সোনা মিয়া’ পরিচয়ে মামলায় আসামি হন বলে পুলিশের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কারাগারে সংরক্ষিত নথি অনুযায়ী, ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়ার বাবার নাম মৃত নজির আহমদ, মায়ের নাম সোনারা বেগম এবং স্ত্রীর নাম আয়েশা। তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। ছেলের নাম মোহাম্মদ আলী। তার উচ্চতা ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি এবং ওজন ৫০ কেজি। শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে বাম গালে, ডান গালে ও ডান বাহুতে ক্ষত থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে।
অন্যদিকে, গত ২৩ জুন গ্রেপ্তার হওয়া প্রকৃত সোনা মিয়ার বাবার নামও মৃত নজির আহমদ। তবে তার মায়ের নাম মাহমুদা খাতুন এবং স্ত্রীর নাম জান্নাতুল ফেরদৌস। তার এক ছেলে ও তিন মেয়ে। ছেলের নাম ওমর ফারুক এবং মেয়ের নাম নাহিদা। তার উচ্চতা ৫ ফুট ১ ইঞ্চি এবং ওজন ৪২ কেজি।
এই সোনা মিয়ার শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে ডান বাহুতে, পেটের বাঁ পাশে এবং পিঠের মাঝখানে তিল থাকার তথ্য নথিতে রয়েছে। ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির ছবি এবং গত ২৩ জুন গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়ার ছবির মধ্যেও পার্থক্য পাওয়া যায়।
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আব্দুল মান্নান বলেন, আদালত চারটি শর্তে সোনা মিয়াকে মুক্তির আদেশ দিয়েছেন। শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—কারাগারে থাকা সোনা মিয়ার আইডি কার্ড জমা দেওয়া, প্রতি সপ্তাহে থানায় হাজিরা দেওয়া, কোনোভাবেই দেশত্যাগ না করা এবং প্রতি তিন মাস পরপর আদালতে হাজির হওয়া।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার প্রকৃত আসামিকে দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং আদালতে সোপর্দ করার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মো. আব্দুল মান্নানের ভাষ্য, মামলাটি দায়ের থেকে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় তদন্ত কর্মকর্তার চরম গাফিলতি ছিল বলে মনে হচ্ছে। কারও জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে অন্য ব্যক্তি নিজের পরিচয় দিলে তা যাচাই করে প্রকৃত পরিচয় বের করা তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব। কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রকৃত পরিচয় যাচাই না করেই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।
তার ভাষ্য, এভাবেই প্রকৃত আসামি রমজান জামিনে বেরিয়ে আত্মগোপনে চলে যান। পরে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়। আর নিরপরাধ সোনা মিয়াকে খুঁজে বের করে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়।
কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘ তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, ‘সোনা মিয়া’ নাম ব্যবহার করে রমজানই ওই ঘটনার সূত্রপাত করেছিলেন। আদালতের মুক্তির আদেশও তারা পেয়েছেন। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




