logo
Advertisement

ঘরে ঢুকে প্রবাসীর স্ত্রীকে কুপিয়ে হত্যা, এক সপ্তাহেও গ্রেপ্তার নেই

ঘরে ঢুকে প্রবাসীর স্ত্রীকে কুপিয়ে হত্যা, এক সপ্তাহেও গ্রেপ্তার নেই
(বাঁয়ে) মাদারীপুরে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিহত আইভী আক্তার, (ডানে) আইভীর কবরের পাশে কান্না ও আহাজারি করছেন স্বজনেরা। ছবি: এশিয়া পোস্ট কোলাজ

হাতের মেহেদির রং তখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি। নতুন সংসার, অনার্সে ভর্তি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখছিলেন আইভী আক্তার। বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই সেই স্বপ্ন থেমে গেল। গত ৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় মাদারীপুর সদর উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের সাবেক কালিকাপুর গ্রামের বাড়িতে তাকে ধারাল অস্ত্রের আঘাতে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ করেছে তার পরিবার।

ঘরের মেঝে থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় আইভীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্বজনদের দাবি, হত্যার পর তার ব্যবহৃত আইফোন, স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। ঘটনার এক সপ্তাহের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এতে স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ঘটনার সময় আইভীর চাচা কালাম শরীফ নামাজ পড়তে মসজিদে গিয়েছিলেন। চাচি ছায়া বেগম ছিলেন মাদারীপুর শহরে। বাড়িতে একাই ছিলেন আইভী।

নামাজ শেষে বাড়িতে ফিরে কালাম শরীফ ঘরের মেঝেতে আইভীকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। তার চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে আসেন। পরে পুলিশে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে।

পুলিশ জানিয়েছে, আইভীর শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারাল অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মাদারীপুর সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে দাদা-দাদির কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।

আইভী ওই গ্রামের আসলাম শরীফের মেয়ে। পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে ছোটবেলা থেকেই চাচা কালাম শরীফের বাড়িতে বড় হন তিনি। স্বজন ও স্থানীয় লোকজনের কাছে শান্ত, ভদ্র ও মিশুক স্বভাবের হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ফেসবুকের মাধ্যমে শরীয়তপুরের পালং থানার বেনতপুর মুন্সীকান্দি এলাকার মৃত দলিলউদ্দিন সরদারের ছেলে কাতারপ্রবাসী ফেরদৌস সরদারের সঙ্গে আইভীর পরিচয় হয়। পরে তাদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিষয়টি দুই পরিবারকে জানালে পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ে হয়।

বিয়ের পর নতুন সংসার নিয়ে স্বপ্ন দেখছিলেন আইভী। পাশাপাশি অনার্সে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ইচ্ছা ছিল তার।

মামলার পরও গ্রেপ্তার নেই

আইভীর বাবা আসলাম শরীফ ১১ সেপ্টেম্বর মাদারীপুর সদর থানায় মামলা করেন। তবে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

আইভীর ভাই আসিফ বলেন, পুলিশ কেন আসামি ধরতে পারতেছে না, আমরা বুঝতে পারতেছি না। পুলিশের কাছে জিজ্ঞাসা করলে তারা বলে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আমরা চাই প্রশাসন দ্রুত আমার বোনের হত্যাকারীকে ধরে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করুক।

আইভীর বাবা আসলাম শরীফ বলেন, আমার মেয়েকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। যারা হত্যা করেছে, তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে। আমি হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।

আইভীর মা আকলিমা বেগম মেয়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, এখনও যারা তোরে মেরেছে, পুলিশ তাদের ধরতে পারেনি। তাদের বিচার করতে পারতেছি না। আল্লাহ তাদের বিচার করবে। তোরে যারা কষ্ট দিয়ে মারছে, তাদের শাস্তি হলে তুই কবরে বইসাও একটু শান্তি পাতি মা। আমরাও একটু শান্তি পেতাম।

আইভীর চাচি ছায়া বেগম বলেন, আইভী খুবই শান্ত স্বভাবের মেয়ে ছিল। আইভীর যখন ১০ দিন বয়স, তখন আমরা তাকে লালনপালন করে বড় করেছি। লেখাপড়া ও বিয়ে পর্যন্ত দিয়েছি। ওর বাবা গরিব, তাই ছোটবেলা থেকেই আইভীর সব দায়িত্ব আমরা নিয়েছি। ও আমার মেয়ে না, ও আমার মা। ওর হত্যার বিচার চাই। হত্যার প্রকৃত কারণও জানতে চাই।

স্বজনদের দাবি, আইভীকে হত্যার পর তার আইফোন, স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এ কারণে তাদের ধারণা, চুরির উদ্দেশ্যে হত্যাকাণ্ডটি ঘটতে পারে। তবে হত্যার কারণ এখনও নিশ্চিত নয়।

আইভীর চাচা কালাম শরীফ বলেন, নামাজ পড়ে বাড়িতে ফিরে ঘরের মেঝেতে আইভীকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখি। তখন চিৎকার করে আশপাশের লোকজনকে ডাকি এবং পুলিশকে খবর দিই। যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হোক।

মাদারীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, নিহত আইভীর শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারাল অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। চুরির উদ্দেশ্যে, নাকি অন্য কোনো কারণে হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে তদন্তের পাশাপাশি অভিযান চলছে।