logo

ভাত ছিটালেও এখন কাক আসে না

ভাত ছিটালেও এখন কাক আসে না

একসময় গ্রামের মানুষের ঘুম ভাঙত মোরগের ডাকে, আর শহরের সকাল হতো কাকের কোলাহলে। ভোরের আলো ফোটার আগেই পাড়া-মহল্লার আঁস্তাকুড়ে শুরু হতো কাকের ‘আড্ডা’। কোথাও খাবার নিয়ে হট্টগোল, কোথাও আবার বিদ্যুতের তারে সারবেঁধে বসে একটানা ‘কা কা’ ডাক—এই দৃশ্য ছিল নগরজীবনের চেনা অংশ। কিন্তু সময়ের পালাবদলে এখন বদলে গেছে সেই চিত্র।

ইট-পাথরের উঁচু দালানে ভরপুর জামালপুর শহরে এখন ভাত ছিটালেও আর কাক আসে না। উঁচু গাছ কাটা, খাদ্য সংকট, বিষক্রিয়া ও পরিবেশগত নানা সমস্যার কারণে কমছে এই পাখির সংখ্যা। প্রাকৃতিক পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে পরিচিত কাকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পরিবেশ ও জলবায়ুর ওপর। তবে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জানান, আবাসস্থল ঠিক করা এবং পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা হলে কাকের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব।

যুগ যুগ ধরে প্রতিদিন সকালে হোটেলে তৈরি প্রথম রুটি উৎসর্গ করা হয় কাকসহ অন্য পাখিদের জন্য। এক সময় সেই রুটির জন্য কাকের চেঁচামেচি শোনা যেত, তবে এখন সেটি পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।

জামালপুর শহরের দড়িপাড়া এলাকার হোটেল শ্রমিক আসলাম মিয়া বলেন, আগে রুটি দিতাম, আটটা-দশটা করে। কাক আসত, শকুন আসত, পাখি আসত। এখন আর কোনো পাখি আসে না। এখন সকালে রুটি দেই, রুটি পড়ে থাকে খাওয়ার কেউ থাকে না।

একই এলাকার আরেক হোটেল ব্যবসায়ী সেলিম মিয়া বলেন, আগে অনেক কাক-পাখি আসত। আমরা খাবার দিতাম। এখন খুব কম আসে কাক। আগে কাকের জ্বালায় আমরা টিকতে পারতাম না। এখন কাক নেই বললেই চলে।

শুধু হোটেল নয়, ময়লার ভাগাড় ও ডাস্টবিনেও দেখা মিলছে না কাকের। বিশাল আকাশে এক সময় কাকের ঝাঁক দেখা যেত, কিন্তু এখন সেই আকাশও নিঃসঙ্গ ও নীরব। ব্যস্ত নগরী জামালপুর শহর থেকে একেবারেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে সাহসী এই পাখি।

পাখি সংশ্লিষ্টরা বলেন, শহরের উঁচু গাছ কাটা, নিরাপত্তা, খাদ্যে বিষক্রিয়া ও খাদ্যে ভেজালসহ নানা কারণে কমছে এই বিচক্ষণ পাখির সংখ্যা।

জামালপুর পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি জাহাঙ্গীর সেলিম এশিয়া পোস্টকে বলেন, প্রাকৃতিক পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে পরিচিত আমাদের কাক আজ বিলুপ্তির পথে। এর মূল কারণ কী? খাদ্যে বিষক্রিয়া, ভেজাল পণ্য খাদ্য এবং অন্যান্য কারণে কাক এখন খাবার সংকটে ভুগছে। উঁচু উঁচু গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। এতে কাকের আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে। কাক চলে যাচ্ছে অন্যত্র।

জামালপুরের সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জুয়েল আহমেদ বলেন, বিশ্বে ৪০টির বেশি কাকের প্রজাতি থাকলেও বাংলাদেশে সাধারণত ২ প্রজাতির কাক রয়েছে। গৃহকাক আর জংলা/বুনো কাক। এরা ময়লা খেয়ে বেঁচে থাকে। সম্প্রতি শহরে ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট ঠিকমতো হচ্ছে না। যার ফলে কাকদের খাবারের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। ফলে কাকের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমছে। জলবায়ু পরিবর্তনেরও কিছু প্রভাব রয়েছে কাকের সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে।

প্রাণিবিদরা সতর্ক করে বলেন, কাক না থাকায় পচনশীল বস্তুর আধিক্য বাড়ছে, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তাই শকুন রক্ষার মতো কাক রক্ষার জন্যও কর্মসূচি গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবিএম মোশারফ হোসেন বলেন, এখন কাকের সংখ্যা কমে যাওয়ার ফলে পৃথিবীতে পচনশীল বস্তুর আধিক্য বাড়ছে। এতে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এটা সহজে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, কারণ এটা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। তবে আমরা কিছু ক্ষণস্থায়ী উপায় অবলম্বন করতে পারি, যেমন কাকের খাবারের ব্যবস্থা করা, আবাসস্থল ধ্বংস না করা।

জেলার বিশিষ্ট আইনজীবী মোহাম্মদ ইউসূফ বলেন, আমাদের দেশে যেমন শকুন রক্ষার জন্য একটি কর্মসূচি সরকার নিয়েছে, তেমন কাক রক্ষার জন্যও একটি কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত, যাতে দেশে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হয়।

এ বিষয়ে জামালপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. ছানোয়ার হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, কাকদের আবাসস্থল যদি ঠিক করা হয় এবং বর্জ্যগুলো পরিবেশবান্ধবভাবে পরিচালনা করা হয়, তাহলে কাক ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারবে। এতে কাকের সংখ্যা পূর্বের মতো বৃদ্ধি পাবে এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকবে। আমরা চেষ্টা করব কাকের সংখ্যা বৃদ্ধি করার। প্রকৃতির সব প্রাণী আমাদের কাছে প্রয়োজনীয়।

পরিবেশবিদদের মতে, প্রকৃতির এই পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে বাঁচাতে এখনই উদ্যোগ না নিলে নীরব হয়ে যাবে আরও অনেক ভোর, আরও অনেক আকাশ।