চট্টগ্রামে ৪১২ মিলিমিটার রেকর্ড বৃষ্টি: ডুবল নগরী, যোগাযোগে বিপর্যয়

টানা তিন দিনের অবিরাম বর্ষণ ও সাগরের জোয়ারের পানিতে ভাসছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা চট্টগ্রামের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড। স্মরণকালের এই ভয়াবহ জলাবদ্ধতায় নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা বুক সমান পানিতে তলিয়ে গেছে। জলাবদ্ধতার পাশাপাশি পাহাড়ধসে প্রাণহানি, সড়ক ধস এবং রেলযোগাযোগ ভেঙে পড়ায় অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়েছেন লাখো নগরবাসী।
৪৩ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ সুমন সাহা এশিয়া পোস্টকে জানান, আজ বিকেল ৩টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ইতিহাস অনুযায়ী, এটি চট্টগ্রামের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টার বৃষ্টিপাত। এর আগে আজ থেকে ৪৩ বছর আগে, ১৯৮৩ সালের ৪ আগস্ট চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ৫১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল।
জলমগ্ন নগরী, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
টানা বর্ষণের সঙ্গে সাগরের জোয়ারের পানি যুক্ত হওয়ায় নগরীর চকবাজার, কাতালগঞ্জ, শোলকবহর, রহমতগঞ্জ, কাপাসগোলা, ফরিদার পাড়া, জিইসি, আগ্রাবাদ, মুরাদপুর, কুসুমবাগ ও হালিশহরসহ বিভিন্ন এলাকা কোথাও হাঁটু, আবার কোথাও কোমর থেকে বুক সমান পানিতে তলিয়ে গেছে।
নিচু এলাকার বহু বাসাবাড়ি এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়ায় আসবাবপত্র ও মালামালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। থমকে গেছে নগরীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।

পাহাড়ধসে প্রাণহানি ও সড়ক-রেল যোগাযোগে বিপর্যয়
দুর্যোগপূর্ণ এই আবহাওয়ায় নগরীর বিভিন্ন স্থানে বড়ো ধরনের দুর্ঘটনা ও যোগাযোগ বিপর্যয়ের খবর পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) বিকেলে নগরীর রহমান নগর এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। এতে একজন নিহত এবং চারজন আহত হয়েছেন। গতকাল সোমবার মধ্যরাতে পতেঙ্গার আউটার রিং রোডের সংযোগ সড়কের এক পাশ ধসে পড়ে। ফলে বন্দরমুখী পণ্যবাহী গাড়ি চলাচলে তীব্র প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়েছে।
রেললাইনে পানি, ৯ ঘণ্টা আটকে পর্যটক এক্সপ্রেস
রেললাইনে পানি জমে যাওয়ায় ঢাকা থেকে ভোর ৬টায় ছেড়ে আসা ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’ দুপুরের দিকে ষোলশহর স্টেশনের কিছু সামনে আটকে যায়। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (রাত সাড়ে ৮টা) ট্রেনটি দীর্ঘ ৯ ঘণ্টা ধরে সেখানেই অবস্থান করছিল। ওয়াটারিংয়ের (পানি সরবরাহ) জন্য ট্রেনটিকে পুনরায় চট্টগ্রাম স্টেশনে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। ফলে ট্রেনের সহস্রাধিক যাত্রী চরম দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন।
এ ছাড়াও বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়ির নিচতলায় হাঁটু পর্যন্ত পানি ঢুকে আসবাবপত্র ভিজে গেছে। একইভাবে বিভিন্ন নিচু এলাকার দোকানপাটে পানি ঢুকে ব্যবসায়ীদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে উচ্ছেদ ও আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ
পাহাড়ধসের ঝুঁকি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম মহানগরের চিহ্নিত ২৬টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে প্রায় ৬ হাজার ৫৫৮টি পরিবার বসবাস করছে।
প্রশাসনের জরুরি ভিত্তিতে ২৬টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়কে ৫টি জোনে ভাগ করে প্রতি জোনে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিশেষ টিম ও প্রায় ১৫০ জন স্বেচ্ছাসেবক মাঠে কাজ করছেন।
ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দাদের নিরাপত্তায় আটটি স্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রের পাশাপাশি পাহাড়সংলগ্ন স্কুল, কলেজ, মসজিদ ও মাদ্রাসাগুলোকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
সোমবার রাত থেকেই আকবর শাহর ১, ২ ও ৩ নম্বর ঝিল, বিজয়নগর, শান্তিবাগ, বেলতলীঘোনা, টাংকির পাহাড়, আমিন জুটমিল এলাকা, পাহাড়িকা, সমবায় আবাসিক এলাকা, মিয়ার পাহাড়, মুরাদপুর রেলস্টেশনসংলগ্ন পাহাড়, মতিঝরনা, পোড়া কলোনি, ঢেবারপাড়, আমবাগান ও উত্তর হালিশহরসহ বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। বর্তমানে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে মোট ২১৫ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।
এ ছাড়াও উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বহু পরিবার নিজেদের উদ্যোগে আত্মীয়স্বজনের বাসায় নিরাপদে অবস্থান নিয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।





