logo

বেইলি সেতু ভেঙে ৩ বছর ধরে বিচ্ছিন্ন বিষ্ণু কার্বারি পাড়ার অধিবাসীরা

বেইলি সেতু ভেঙে ৩ বছর ধরে বিচ্ছিন্ন বিষ্ণু কার্বারি পাড়ার অধিবাসীরা
খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় অবস্থিত ভেঙে যাওয়া বেইলি সেতু। ছবি: এশিয়া পোস্ট

খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার দুর্গম বিষ্ণু কার্বারি পাড়ার মানুষের যোগাযোগের একমাত্র ভরসা বেইলি সেতুটি ভেঙে গিয়েছে প্রায় তিন বছর। দীর্ঘদিনেও সেতুটি পুনর্নির্মাণ না হওয়ায় ছড়ার ওপারে থাকা অন্তত পাঁচটি গ্রামের মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। বর্ষা মৌসুমে ছড়ার পানি বেড়ে গেলে কয়েকদিনের জন্য কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে পুরো এলাকার অধিবাসীদের।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিষ্ণু কার্বারি পাড়াসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের উৎপাদিত ফসল, শাক-সবজি বাজারজাত করা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার প্রধান বাজার দীঘিনালা উপজেলা সদর। কিন্তু বেইলি সেতুটি ভেঙে যাওয়ার পর সরাসরি যাতায়াত বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে ছড়ার পানি কম থাকলে হাঁটু পরিমাণ কাদামাটির পানি পেরিয়ে ঝুঁকি নিয়ে বাজারে যেতে হচ্ছে।

স্থানীয় অধিবাসী লিটন ত্রিপুরা বলেন, গত তিন বছর ধরে আমাদের এই দুর্ভোগ চলছে। বাজারে যেতে হলে পানি পার হয়ে যেতে হয়। বর্ষার সময় পানি বেড়ে গেলে দুই-তিন দিন পর্যন্ত আমরা কোথাও যেতে পারি না। দ্রুত একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ করা আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি।

আরেক অধিবাসী মৃত্যুঞ্জয় ত্রিপুরা বলেন, বৃষ্টি হলে ছড়ার পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। তখন শিশু, নারী ও বয়স্কদের নিয়ে পারাপার করা সম্ভব হয় না। বিশেষ করে, মহিলা প্রয়োজনীয় খাবার বা ওষুধ আনতেও কোথাও যেতে পারি না আর। মনে হয় আমরা যেন আমরা বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপে বসবাস করছি আমরা।

স্থানীয় কৃষক গণেশ ত্রিপুরা বলেন, এই এলাকার মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। শাক-সবজি ও বিভিন্ন কৃষিপণ্য দীঘিনালা বাজারে নিয়ে বিক্রি করতে হয়। কিন্তু ভালোভাবে যাতায়াত করতে না পারায় অনেক সময় উৎপাদিত পণ্য সময়মতো বাজারে নেওয়া যায় না। এতে কৃষকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

এলাকাটিতে রয়েছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বর্ষাকালে ছড়ার পানি বেড়ে গেলে বিদ্যালয়ে যাতায়াতেও চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের।

বিষ্ণু কার্বারি পাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা বৈশা ত্রিপুরা বলেন, একটু বৃষ্টি হলে-ই ছড়ার পানি বেড়ে গেলে শিক্ষার্থী আর আমাদের শিক্ষকদের স্কুলে আসা বন্ধ হয়ে পড়ে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ থাকি। দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যা চলছে। এখানে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ হলে শিক্ষার্থীসহ পুরো এলাকার মানুষের দুর্ভোগ কমবে।

স্থানীয়দের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ জরুরি চিকিৎসা নিয়ে। দুর্গম এই এলাকায় কোনো মুমূর্ষু রোগী কিংবা প্রসূতি নারীকে দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া সম্ভব হয় না যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকায়। ছড়ার পানি বেড়ে গেলে রোগীকে নিয়ে পারাপার অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে জরুরি মুহূর্তে চিকিৎসা না পেয়ে জীবনহানির আশঙ্কাও থাকে।

স্থানীয়রা জানান, বিষ্ণু কার্বারি পাড়ার ছড়ার বিপরীতে থাকা অন্তত পাঁচটি গ্রামের অন্তত ৩শ পরিবারের ১৫শ মানুষের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম এই রাস্তাটি। ছড়ার উপর এই বেইলি সেতুটি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে স্থানীয়দের জীবনযাত্রা অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। তাই দ্রুত পুরোনো সেতুর স্থানে একটি টেকসই ও স্থায়ী সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে খাগড়াছড়ি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার রহমান বলেন, দীঘিনালার বিষ্ণু কার্বারি পাড়ার ব্রিজটি পুরোনো একটি ব্রিজ ছিলো। এই ব্রিজটি আমি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি। আমরা বিষয়টি ঢাকা সদর দপ্তরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। আশাকরি দ্রুত অনুমোদন পাবো। অনুমোদন পেলে দ্রুত দরপত্র করে কাজ চালু করে দেবো। বিষয়টি আমাদের নজরে রয়েছে। দুর্গম এলাকার মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, খাগড়াছড়িতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং মেয়াদ উত্তীর্ণের কারণে ব্রিজ বা কালভার্ট ভেঙে যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে এরকম তথ্য জেলা প্রশাসন দ্রুত সময়ের মধ্যে সড়ক ও জনপদ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ অন্যান্য বিভাগকে নির্দেশনা প্রদান করা আছে। এর বাইরেও আমরা তাৎক্ষণিকভাবে জানতে পারলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সেটার যেন মেরামত হয় বা পুনর্নির্মাণে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। দীঘিনালার বিষ্ণু কারবারি পাড়া ব্রিজের যে বিষয়টি উঠে এসেছে আমরা সেই এলাকাটি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এই দুর্ভোগের অবসানে দ্রুত সেতুটির স্থায়ী সমাধান করা হবে। একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ হলে বিষ্ণু কার্বারি পাড়াসহ ছড়ার ওপারে থাকা অন্তত পাঁচটি গ্রামের মানুষের যোগাযোগ, কৃষিপণ্য, বাজারজাতকরণ, শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবায় নতুন করে সুযোগ তৈরি হবে।