logo

শেরপুরের গারো পাহাড়ে বন্যহাতি, দেশ আছে কিন্তু ফেরার পথ নেই

শেরপুরের গারো পাহাড়ে বন্যহাতি, দেশ আছে কিন্তু ফেরার পথ নেই
শেরপুরের গারো পাহাড়ে বন্যহাতির চলাচল। ছবি: এশিয়া পোস্ট

একসময় শেরপুরের গারো পাহাড়ের বুক চিরে নির্বিঘ্নে চলাচল করত বন্যহাতির পাল। পাহাড়, বন আর ঝিরিপথ পেরিয়ে তারা ছুটত এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায়। সেই পথের দুই পাশে এখন বসতি, কৃষিজমি আর মানুষের ব্যস্ততা। কোথাও বন কেটে তৈরি হয়েছে আবাদি জমি, কোথাও গড়ে উঠেছে ঘরবাড়ি।

ফলে সংকুচিত হয়ে পড়েছে হাতির চলাচলের স্বাভাবিক পথ। খাবারের সন্ধানে পাহাড় থেকে হাতি নেমে এলেই বদলে যায় সীমান্ত জনপদের চিত্র। আতঙ্কে অস্থির হয়ে পড়ে মানুষ। তছনছ করে ফসলের মাঠ। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঘরবাড়ি। ফসল রক্ষা ও হাতি তাড়াতে গিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে মানুষ। কখনো প্রাণ হারায় মানুষ, কখনো বা মৃত্যুর কবলে পড়ে হাতি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তঘেঁষা গারো পাহাড়ে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে এই মানুষ-হাতির সংঘাত। হাতি লোকালয়ে ঢোকার ঘটনাকে শুধু বন্যপ্রাণীর আচরণ হিসেবে দেখলে সমস্যার পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। মানুষের বসতি ও কৃষিজমি বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সংকুচিত হয়েছে হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের পথ। ফলে মানুষ ও হাতি দু’পক্ষই ক্রমেই কাছাকাছি চলে এসেছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, হাতির পাল সাধারণত রাতের আঁধারে লোকালয়ে প্রবেশ করে। ফসলের মাঠে ঢুকে ধান, ভুট্টা, সবজিসহ বিভিন্ন ফসল নষ্ট করে। অনেক সময় ঘরবাড়িতেও হামলা চালায়। হাতি তাড়াতে গিয়ে স্থানীয়রাও ঝুঁকির মুখে পড়েন। ফলে হাতির উপস্থিতি মানেই অনেক পরিবারের কাছে আতঙ্কের রাত।

বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, ২০০০ সালের দিকে গারো পাহাড়ি এলাকায় ১০-১৫টি বন্যহাতির আগমন ঘটেছিল। বর্তমানে বংশবিস্তার করে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দেড় শতাধিকের ওপর। গারো পাহাড়ে বিচরণ করা এসব বন্যহাতি ভারতের আদি আবাসস্থলে ফিরতে না পেরে দুই যুগেরও অধিক সময় ধরে শেরপুর ও জামালপুর জেলার গারো পাহাড়ি এলাকায় আটকা পড়ে আছে। হাতিগুলো কখনো ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, ধোবাউড়াসহ সীমান্ত এলাকার লোকালয়ে নেমে আসছে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ার গেটগুলো বন্ধ থাকায় তারা ফিরতে পারছে না তাদের আদি নিবাসে।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভারতের কাঁটাতারের বেড়ার সঙ্গে সংযুক্ত গেটগুলো খুলে দিতে বারবার অনুরোধ করা হলেও ভারত তা প্রত্যাখ্যান করেছে। যার ফলে বন্যহাতিগুলো মেঘালয়ের গহিন বনজঙ্গলে ফিরতে পারছে না। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, হাতির কি দেশ আছে, দেশ থাকলে কেন যেতে পারছে না সেই দেশে। নাকি বাংলাদেশেই তাদের দেশ। সেটাও এখন ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঢাকার কেন্দ্রীয় বনাঞ্চলের বনসংরক্ষক এএসএম জহির উদ্দিন আকন বলেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ২০০৭ সালে শেরপুর ও জামালপুর জেলার সীমান্তে ৫০ কিলোমিটার কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করে। পরে হাতির পাল মাঝেমধ্যে বেড়া ভেঙে ফেলায় কাঁটাতারের বেড়ার সঙ্গে প্রায় ৪৪টি গেট বসানো হয়। বন্যহাতি চলাচলের জন্য নদী ও ছড়ার ওপর ১১টি আন্ডারপাসও তৈরি করা হয়। গত দুই বছর ধরে সব গেট বন্ধ রয়েছে। আন্ডারপাস দিয়ে ভারতে ফেরানোর চেষ্টা করা হলে হাতিগুলোকে তাড়িয়ে আবার বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।

বন বিভাগের হিসাব মতে, বর্তমানে প্রায় দেড় শতাধিক বন্যহাতি গারো পাহাড়ে অবাধে বিচরণ করছে। যার মধ্যে ২৫-৩০টি শিশুহাতি রয়েছে। শেরপুর ও জামালপুরের প্রায় ১২ হাজার হেক্টর বন ও আশপাশের এলাকায় কয়েকটি উপদলে বিভক্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায় এসব হাতি। তাদের দীর্ঘ দিনের অবস্থান ওই এলাকার কৃষিকাজে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। বাংলাদেশের বনাঞ্চলে তেমন খাদ্য না থাকায় এসব বন্যহাতি খাদ্যের সন্ধানে মানুষের বাড়ি-ঘরে, আবাদি ফসলের মাঠে কিংবা সবজি ক্ষেতে হানা দেয়।

হাতি আর মানুষের দ্বন্দ্বে কখনও হাতি আবার কখনো মানুষ মারা যাচ্ছে। এ অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চললেও কোনো স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। বেঁচে থাকতে খাদ্যের সন্ধানে হাতিগুলো এলাকার মানুষের বসতবাড়িতে হানা দিয়ে জানমালের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করছে। সরকার নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ সঠিক সময়ে পাচ্ছে না ক্ষতিগ্রস্তরা। আবার পাহাড়ি এলাকায় বন বিভাগের জমি, খাস জমি ও খ তফশিলভুক্ত জমির ক্ষতিপূরণ পেতে নানা হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।

নালিতাবাড়ী উপজেলার নয়াবিল ইউনিয়নের দাওধারা গ্রামের কৃষক আব্দুল হালিম বলেন, গত বোরো মৌসুমে বন্যহাতি তার জমির প্রায় ৪০ মণ পাকা বোরো ধান নষ্ট করে দিয়েছে। এখনও তিনি বনবিভাগ থেকে কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি।

একই উপজেলার পোড়াগাঁও ইউনিয়নের বুরুঙ্গা গ্রামের কৃষক এরশাদ আলম বলেন, বন্যহাতির হামলার ভয়ে গত দুই বছর ধরে মধুটিলা বনাঞ্চলের কাছে তার আড়াই একর জমিতে চাষাবাদ বন্ধ করে রেখেছেন।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের তথ্যমতে, গত ১৩ বছরে শেরপুরের এই অঞ্চলে মানুষ-হাতির সংঘাতে মারা গেছে ৩৩টি বন্যহাতি। একই সময়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৪ জন মানুষ। অর্থাৎ সংঘাতের প্রতিটি পর্বেই ক্ষতির মুখে পড়ছে দুই পক্ষ। হাতির আক্রমণে মানুষের প্রাণহানি যেমন উদ্বেগজনক, তেমনি সংঘাতের কারণে বন্যহাতির মৃত্যুও পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় সংকেত। পরিস্থিতি সামাল দিতে তাৎক্ষণিকভাবে হাতি তাড়ানো হলেও মূল সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।

বন বিভাগের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শেরপুরে বন্যহাতির হামলায় অন্তত ৩৫৬টি ঘটনায় ঘরবাড়ি ও ফসলের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেইসঙ্গে ৪৩৫ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে।

জেলা বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের ওয়াইল্ডলাইফ রেঞ্জার মো. আব্দুল্লাহ আল আমিন এশিয়া পোস্টকে বলেন, হাতির খাদ্যসংকট ও লোকালয়ে প্রবেশ কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। হাতির আবাসস্থল রক্ষা এবং মানুষ ও হাতির সহাবস্থান নিশ্চিত করাও এসব উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। এরই মধ্যে সংঘাত কমাতে গারো পাহাড়ে হাতির জন্য খাদ্যবাগান তৈরিসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হাতির স্বাভাবিক আবাসস্থল ও চলাচলের পথ রক্ষা এবং মানুষ ও হাতির সহাবস্থান নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন এশিয়া পোস্টকে বলেন, হাতি-মানুষের সংঘাত কমাতে গারো পাহাড়ে হাতির জন্য খাদ্য বাগান সৃজন করা হয়েছে। হাতির আবাসস্থল রক্ষা এবং সংঘাত কমাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কাজ চলছে। হাতির দ্বারা কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সরকার তাদের সহযোগিতা দিচ্ছে। পাশাপাশি কনটেন্ট ক্রিয়েটর যারা আছেন, তাদের সাথে আলোচনা করে সচেতনতা তৈরি করে যাচ্ছি। একই সাথে মানুষ ও হাতির সহাবস্থান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এমএ আজিজ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ফসলের ক্ষেতে ঢুকে পড়া হাতিগুলোকে প্রায়ই গ্রামবাসী তাড়া করে। এ সময় তাড়া খেয়ে ভারতের কাঁটাতারের বেড়ার কাছে পৌঁছে আটকা পড়ে যাওয়া হাতিগুলো আরও বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়ে। তাই বাংলাদেশ ও ভারতকে অবশ্যই আটকে পড়া বন্যহাতির সমস্যার সমাধান করতে হবে। হাতিগুলো যাতে অবাধে চলাচল করতে পারে, সেজন্য গেট খুলে দিতে হবে। বাংলাদেশ ও ভারত ২০১৭ সালে আন্তঃসীমান্ত হাতি সংরক্ষণ নিয়ে আলোচনা শুরু করে এবং ২০২০ সালের ডিসেম্বরে একটি প্রটোকল স্বাক্ষর করে। এরপর তেমন কোনো কার্যকর অগ্রগতি হয়নি। আমরা চাই, দ্রুত এর কার্যকারিতা।

ময়মনসিংহ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী নুরুল করিম এশিয়া পোস্টকে বলেন, মানুষ যদি হাতিদের বিরক্ত না করে, তাহলে সাধারণত হাতি মানুষের কোনো ক্ষতি করে না। কিন্তু ফসল বাঁচাতে মানুষ হাতির মুখোমুখি হয়। যার ফলে সংঘাত তৈরি হয়। এ সংঘাত কমাতে সরকার ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করেছেন। তবে, বর্তমানে অনেকেই হাতিকে বিরক্ত করছে, যার ফলে হাতি ক্ষুব্ধ হয়ে অনেক সময় আক্রমণাত্মক আচরণ করছে। এতে কখনো কখনো প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। হাতির আক্রমণে মানুষের প্রাণহানি কিংবা ফসলি জমির ক্ষতি হলে সঠিক তদন্তের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি, হাতি ও মানুষের মধ্যে সংঘাত এড়াতে স্থানীয় পর্যায়ে সভা-সেমিনারের আয়োজন করে মানুষকে হাতিকে বিরক্ত না করার এবং হাতির প্রতি সহনশীল আচরণ করার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বন্যহাতির আক্রমণে কেউ নিহত হলে তার পরিবারকে ৩ লাখ টাকা, আহত ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা এবং ফসলসহ জানমালের ক্ষতির জন্য সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সরকারি বিধান রয়েছে।

শেরপুর-২ (নকলা-নালিতাবাড়ী) আসনের সংসদ সদস্য প্রকৌশলী মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী এশিয়া পোস্টকে বলেন, হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব কমাতে গারো পাহাড়ে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে বন্যহাতির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে কয়েকটি এআই-ভিত্তিক ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। হাতি যখনই লোকালয়ের দিকে অগ্রসর হবে, তখনই ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছবি তুলে ‘টেলিগ্রাম’ অ্যাপের মাধ্যমে এক মিনিটের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মোবাইলে সতর্কবার্তা পাঠিয়ে দেবে। এর ফলে দ্রুত এলাকার মানুষ আগেভাগেই সতর্ক হতে পারবেন, যা প্রাণহানি ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি বিপুল পরিমাণে কমিয়ে আনবে।

তিনি আরও বলেন, হাতি আমাদের দেশের সম্পদ, তাই কোনোভাবেই হাতির ক্ষতি করা যাবে না। আমি ইআরটি সদস্যদের সম্মানী ভাতা বাড়ানোর জন্য উচ্চ পর্যায়ে কথা বলব। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দাদের দক্ষ করে তোলা হবে। মানুষ ও হাতির সহাবস্থান নিশ্চিত করতে যা যা প্রয়োজন, তার সবই করা হচ্ছে। এ ছাড়া হাতি উপদ্রুত এলাকায় ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ‘বায়ো ফেন্সিং’ নির্মাণ এবং ৫ হেক্টর জমিতে হাতির খাদ্য উপযোগী বাঁশ বাগান তৈরির কাজ চলমান রয়েছে।