logo
Advertisement

‘কাটা খাল’ আবার খনন, শ্রমিক বঞ্চিত করে ইউএনওর টাকা ফেরত

এশিয়া পোস্ট নিউজ,বরগুনা
‘কাটা খাল’ আবার খনন, শ্রমিক বঞ্চিত করে ইউএনওর টাকা ফেরত
বরগুনার আমতলীতে দুটি খাল খননে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ইনসেটে ইউএনও মুহাম্মাদ জাফর আরিফ চৌধুরীর। এশিয়া পোস্ট

বরগুনার আমতলীতে অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান প্রকল্পের দুটি খাল খননে ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এক বছর আগে খনন করা খাল পুনরায় খনন দেখানো, ম্যানুয়াল শ্রমিকের পরিবর্তে ভেকু (এক্সকাভেটর) ব্যবহার এবং দরিদ্র শ্রমিকদের পাওনা মজুরি না দিয়েই সরকারি কোষাগারে টাকা ফেরত দেখানোর নামে কোটি টাকার প্রকল্পে হরিলুটের ঘটনা ঘটেছে।

Advertisement

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অধীনে আমতলী উপজেলার কুকুয়া ইউনিয়নের পশ্চিম কেওয়াবুনিয়া খালের তিন কিলোমিটার এবং হলদিয়া ইউনিয়নের পশুরবুনিয়া খালের দুই কিলোমিটার খননের জন্য মোট ১ কোটি ২৮ লাখ ৮২ হাজার ৮৩৭ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে কেওয়াবুনিয়া খালের জন্য ৭৭ লাখ ২৮ হাজার ৮৪২ টাকা এবং পশুরবুনিয়া খালের জন্য ৫১ লাখ ৫৩ হাজার ৯৯৫ টাকা বরাদ্দ ছিল।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট নথি ও স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, দুটি খাল খননের পর সরকারি কোষাগারে ৩৭ লাখ ৫০ হাজার ৫৪০ টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। বাকি অর্থের একটি অংশ শ্রমিকদের মজুরি ও খননকাজে ব্যয় হওয়ার কথা থাকলেও তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

অভিযোগ রয়েছে, দুটি প্রকল্পে মোট ৩৯৭ জন অতিদরিদ্র শ্রমিকের কাজ করার কথা থাকলেও বাস্তবে কাজ করেছেন ১৫৯ জন। তাদের অনেকেই এখনো পুরো মজুরি পাননি। কয়েকজন শ্রমিক জানিয়েছেন, আংশিক টাকা দেওয়া হলেও বাকি টাকা পরে দেওয়ার কথা বলে তাদের ঘোরানো হচ্ছে।

ছয় দিন কাজ করেও পুরো মজুরি না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন শ্রমিক ওমর গাজী, মারুফ হাওলাদার ও সুমন হাওলাদার। তারা বলেন, ছয় দিনের মধ্যে তিন দিনের মজুরি পেয়েছেন, বাকি টাকা এখনও পাননি। শ্রমিক নাজমুল বলেন, ছয় দিন কাজ করেছি। মাত্র দেড় হাজার টাকা পেয়েছি। বাকি টাকা এখনও পাইনি। টাকা চাইতে গেলে পরে দেওয়া হবে বলে ঘোরানো হচ্ছে।

কাজের পরও শ্রমিকদের মজুরি বাকি থাকলে সরকারি কোষাগারে টাকা ফেরত দেওয়া হলো কীভাবে—এ প্রশ্ন তুলে বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

এদিকে কেওয়াবুনিয়া খাল নিয়ে আরও একটি অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় এক বছর আগে খালের এক পাশ কেটে সেখানে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছিল। পরে সেই খালই আবার খনন করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা নুর আলম ও সেকান্দার খান বলেন, এক বছর আগে খালের এক পাশ কেটে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছিল। এবার সেই খালই আবার কাটা হয়েছে।

কেওয়াবুনিয়া খাল খনন প্রকল্পের সভাপতি কুকুয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য জহির উদ্দিন মাতুবর জানান, কাগজে-কলমে তাকে প্রকল্প সভাপতি করা হলেও প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) ও তাদের লোকজন করেছেন। তিনি তাঁদের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করেছেন।

জহির উদ্দিন মাতুবরের ভাষ্য, তিন কিলোমিটার কেওয়াবুনিয়া খাল খননের জন্য ১৮ লাখ টাকার চুক্তিতে একটি ভেকু মেশিন নেওয়া হয়েছিল। ওই মেশিন দিয়েই খননকাজ করা হয়েছে। তবে খালটির এক পাশ আগে কেটে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছিল—এ অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।

পশুরবুনিয়া খাল খনন প্রকল্পের সভাপতি হলদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য কালু মৃধা বলেন, দুই কিলোমিটার খাল খননের বরাদ্দ থাকলেও শ্রমিক দিয়ে কাজ করা হয়নি; ভেকু মেশিন দিয়ে খনন করা হয়েছে। মেশিনের মালিককে ৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিল দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, কাগজে-কলমে আমাকে প্রকল্প সভাপতি করা হলেও বাস্তবে আমি কিছুই না। ইউএনও ও পিআইও স্যারের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করেছি। তার দাবি, এই প্রকল্পে ১১৯ জন শ্রমিক কাজ করলেও তাদের কাউকে এখনও মজুরি দেওয়া হয়নি। শ্রমিকদের মজুরি দেওয়ার বিষয়ে তিনি একাধিকবার ইউএনওকে জানিয়েছেন।

খননকাজে ব্যবহৃত ভেকু মেশিনের মালিক মো. জামাল সিকদার বলেন, তিনি ২ হাজার ২০০ মিটার খাল খনন করেছেন। এর জন্য প্রকল্প সভাপতি তাকে ৩ লাখ টাকা দিয়েছেন। বাকি টাকা এখনও পাননি বলে দাবি করেন তিনি।

প্রকল্পের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য খালের দুই পাড়ে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগানোর কথা থাকলেও বাস্তবে গাছ দেখা যায়নি বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

আমতলী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) রুনু বেগম বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশনা অনুযায়ী খাল খননের কাজ শেষ করা হয়েছে। শ্রমিকদের মজুরি না পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রকল্প সভাপতির সঙ্গে আলোচনা করেন। সমুদয় টাকা দেওয়া হয়েছে।

সদ্য বিদায়ী আমতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুহাম্মাদ জাফর আরিফ চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ত আছেন জানিয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। তবে শ্রমিকদের মজুরি না দিয়ে সরকারি কোষাগারে টাকা ফেরত দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিস্তারিত কিছু না বলে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।