ফুলকুঁড়িদের নিয়ে আলোর পথের গন্তব্যে ফুলকুঁড়ি এক্সপ্রেস

বিদ্যালয়ের প্রধান ফটক পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই চমকে যেতে হয়। বিদ্যালয়ের অফিস, কিংবা শ্রেণিকক্ষের বদলে দাঁড়িয়ে আছে আস্ত এক রেলওয়ে স্টেশন। সেখানে একটি রেলগাড়িও দাঁড়িয়ে আছে। চোখ কচলে একটু ভালো করে তাকালে দেখা যাবে, গোটা বিদ্যালয়টি সাজানো হয়েছে রেলগাড়ির আদলে।
এ দৃশ্য চোখে পড়ে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলা পরিষদ পরিচালিত ফুলকুঁড়ি বিদ্যানিকেতনে। বিদ্যালয়টির শ্রেণিকক্ষের দরজা-জানালাসহ বারান্দায় ট্রেনের বগির আদলে রেলওয়ের নকশা, নিচে আঁকা চাকা ও রেললাইন।
প্রথম দেখায় যে কারও মনে হতে পারে, ট্রেন বুঝি যাত্রী নিয়ে ছুটে যাওয়ার অপেক্ষায়। একটু কাছে গিয়ে খেয়াল করলেই বোঝা যাবে, এটি কোনো ট্রেন নয়, এটি একটি বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ।
ঠিক তখন পড়ে যায় কবি শামসুর রাহমানের লেখা ছড়ার কথা–‘ঝক ঝকাঝক ঝক ঝকাঝক ট্রেন চলেছে ওই, ট্রেন চলেছে ট্রেন চলেছে ট্রেনের বাড়ি কৈ।’
ফুলকুঁড়ি এক্সপ্রেস নামে এই ট্রেনের বাড়ি কিংবা গন্তব্য অজানা। তবে আছে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। তা হলো ফুলকুঁড়িদের ছড়িয়ে সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত করা।
“আন্তঃনগর ফুলকুঁড়ি এক্সপ্রেস ট্রেনটি” প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৮টায় যাত্রা শুরু করে, ঠিকানায় স্থির থেকেও ছুটে চলে দুপুর ১টা পর্যন্ত। এ ট্রেনের নির্দিষ্ট কোনো স্টেশন না থাকলেও যাত্রীরা ঠিকই পৌঁছে যান বিভিন্ন গন্তব্যে। ট্রেনটি যাত্রীদের পৌঁছে দেয় আলোর পথে। আলোর পথের যাত্রীরা সবাই এলাকার খুদে শিক্ষার্থী এই বিদ্যালয়েরই শিশু থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী তারা।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ফুলবাড়ী উপজেলা পরিষদ কর্তৃক পরিচালিত ফুলকুঁড়ি বিদ্যানিকেতন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি উপজেলার প্রথম বেসরকারি বিদ্যালয়। উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন হওয়ায় এক সময় ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের পদচারণায় মুখরিত থাকত বিদ্যালয় প্রাঙ্গন।

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বিদ্যালয়টি ব্যাপক সুনাম অর্জন করে। পরে বিভিন্ন কারণে বিদ্যালয়টিতে ধস নামে। আওয়ামী লীগের তৎকালীন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার ওই বিদ্যালয়ের পাশে নিজের নামে নামকরণ করে একটি স্কুল নির্মান করলে ফুলকুঁড়ি বিদ্যানিকেতন আরও পিছিয়ে পড়ে। বিলম্বে হলেও বিষয়টি নজরে আসে উপজেলা প্রশাসনের।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিদ্যালয়ের সভাপতি আহমেদ হাছানের সহযোগিতায় আবারও নতুন রুপে যাত্রা শুরু করে বিদ্যালয়টি। বিদ্যালয়ের আগের অধ্যক্ষকে অবসরে পাঠিয়ে নতুন অধ্যক্ষ নিয়োগ দেওয়া হয়। বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নও করা হয়। তার মনোনশীল ধারণা থেকেই বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের রঙ আন্তঃনগর ট্রেনের আদলে করা হয়। এতে বিদ্যালয়টি আবারও ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে।
এই ব্যতিক্রমী সাজ কোমলমতি শিশুদের আকৃষ্ট করছে। পুরোনো টিনশেড ভবনকে সাজিয়ে তোলা হয়েছে রেলগাড়ির আদলে। বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষগুলো বাংলাদেশ রেলওয়ের যাত্রীবাহী ট্রেনের বগির আদলে রঙ করা হয়েছে। শুধু শ্রেণিকক্ষই নয়, অভিভাবকদের বসার কক্ষটিও সাজানো হয়েছে রেলের ইঞ্জিনের আদলে। ফলে পুরো বিদ্যালয়জুড়ে তৈরি হয়েছে রেলভ্রমণের এক অভিনব আবহ।
শিল্পির রঙ তুলির শৈল্পিক ছোঁয়ায় বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি বেড়েছে আগের তুলনায় কয়েকগুণ। নজর কেড়েছে অভিভাবকসহ দর্শনার্থীদের। এই শ্রেণিকক্ষ ভীষণভাবে উপভোগ করছে খুদে শিক্ষার্থীরা। অথচ কিছুদিন আগেই ভবনটি ছিল জরাজির্ণ। টিনের ছাউনির ভাঙ্গাচুড়া ওই ঘরে ক্লাস করতে মন খারাপ হতো শিশুদের।

সরেজমিনে বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের বর্তমান পরিবেশ অনেক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। শ্রেনিকক্ষের ভেতরে শোভা পাচ্ছে চমৎকার সব আল্পনা। ভেতর-বাহির মিলিয়ে নান্দনিক পরিবেশে খুদে শিক্ষার্থীরা আনন্দের সঙ্গে পড়াশোনা করছে।
বিদ্যালয়ে অধ্যক্ষ মো. সোহরাব হোসেন জানান, শিশুদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে এবং শিক্ষার পরিবেশকে আনন্দময় করতে বিদ্যালয়টি নতুনভাবে সাজানো হয়েছে। বিদ্যালয়ের সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ হাছানের প্রচেষ্টায় এই পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু শ্রেণিকক্ষ নয়, অভিভাবকদের বসার ঘরটিও ট্রেনের ইঞ্জিনের আদলে সাজানো হয়েছে। এতে বিদ্যালয়ের পরিবেশে ভিন্নমাত্রা যোগ হয়েছে। নান্দনিক পরিবেশে শিশুরা আনন্দ নিয়ে বিদ্যালয়ে আসছে এবং পড়াশোনার প্রতিও তাদের আগ্রহ বাড়ছে।
অধ্যক্ষ সোহরাব হোসেন আরও জানান, বিদ্যালয়ে বর্তমান শিক্ষার্থী প্রায় দেড়শ। ইউএনও মহোদয়ের পরামর্শে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি একাডেমিক উন্নয়নেও জোর দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষার্থী আতিক হাসান জানায়, ‘এই স্কুলে পড়তে আমাদের খুব ভালো লাগে। ক্লাসরুমে বসলে মনে হয়, আমরা যেন ট্রেনে চেপে কোথাও বেড়াতে যাচ্ছি। জানালার পাশে বসে পড়ছি আর বাইরে তাকিয়ে দৃশ্য দেখছি। এমন অনুভূতি আমাদের খুব ভালো লাগে। বাড়িতে গেলে মনে হয় কখন স্কুলে আসব।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিদ্যালয়ের সভাপতি আহমেদ হাছান বলেন, উপজেলা প্রশাসন পরিচালিত বিদ্যালয়টি সঠিক তদারকির অভাবে জরাজীর্ণ হয়েছিল। বিষয়টি নজরে আসায় উদ্যোগ নিয়ে সংস্কার কাজ শুরু করা হয়েছে। বিদ্যালয়ের সাজসজ্জার কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। একাডেমিক মানোন্নয়নের জন্যও বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। আশা করছি, গৃহীত উদ্যোগের ফলে বিদ্যালয়টি আবারও ঘুরে দাঁড়াবে।



