
ফরিদপুরের গ্রামাঞ্চলে কমে যাচ্ছে বাতাবি লেবু, কদবেল, ডেউয়া, ডালিম, জাম, জামরুল ও কামরাঙাসহ দেশীয় ফলের গাছ। বাড়ির আঙিনা ও পুকুরপাড়ে বসতি ও স্থাপনা বাড়ায় পুরোনো গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। নতুন করে দেশীয় ফলের চারা লাগানোর প্রবণতাও কমেছে।
মধুখালী, বোয়ালমারী, আলফাডাঙ্গা, সালথা ও নগরকান্দাসহ বিভিন্ন উপজেলায় একসময় প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই বাতাবি লেবুসহ নানা দেশীয় ফলের গাছ দেখা যেত। বিশেষ যত্ন ছাড়াই বেড়ে ওঠা এসব গাছে মৌসুমে ফল ধরত। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের মধ্যেও এসব ফল ভাগ করে দেওয়া হতো। এখন অনেক গ্রামেই বাতাবি লেবু কিনতে হচ্ছে বাজার থেকে।
স্থানীয়রা জানান, বাড়ির জায়গা সংকুচিত হওয়া, কৃষিজমির ব্যবহার পরিবর্তন, পুরোনো গাছের বয়স, অপরিকল্পিতভাবে গাছ কাটা এবং নতুন চারা না লাগানোর কারণে দেশীয় ফলের গাছ কমছে। বিদেশি ও বাণিজ্যিক ফলের চাহিদা বাড়ায় কৃষকেরাও দ্রুত লাভের আশায় বাণিজ্যিক বাগানের দিকে ঝুঁকছেন।
বাড়ছে আমের বাগান
দেশীয় ফলের গাছ কমলেও ফরিদপুরের বিভিন্ন এলাকায় আমের বাগান বাড়ছে। বিশেষ করে আম্রপালি বা আমরুপালি জাতের চারা লাগাচ্ছেন কৃষক ও পরিবারগুলো। কম জায়গায় বাগান করা যায়, বাজারে চাহিদা রয়েছে এবং ফল বিক্রি করে আয় করা সম্ভব—এ কারণে এ জাতের আমের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।
ফলে একদিকে কমছে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠা দেশীয় ফলের গাছ, অন্যদিকে বাড়ছে পরিকল্পিত আমের বাগান। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাণিজ্যিক আমচাষের পাশাপাশি দেশীয় ফলের গাছ সংরক্ষণেও গুরুত্ব দিতে হবে।
মৌসুমে ফরিদপুরের বাজারগুলোতে বাতাবি লেবু, কদবেল ও ডালিমের চাহিদা থাকলেও স্থানীয় সরবরাহ আগের তুলনায় কমেছে। আকার ও মানভেদে বাতাবি লেবু ৫০ থেকে ১০০ টাকা বা তারও বেশি দামে বিক্রি হয়।
ক্রেতা মহশিন মিয়া বলেন, আগে বাড়ির আশপাশেই বাতাবি লেবুসহ বিভিন্ন ফল পাওয়া যেত। এখন অনেক ফল বাজার থেকে কিনতে হয়। দেশীয় ফলের গাছগুলো বাড়িতে আবার থাকা দরকার।
বিক্রেতা হারুন শেখ বলেন, আগের তুলনায় অনেক দেশীয় ফল কম পাওয়া যায়। চাহিদা আছে, কিন্তু স্থানীয় সরবরাহ কম।
এ বিষয়ে মধুখালী উপজেলার ৭ নম্বর মেগচামী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাব্বির হোসেন বলেন, আমাদের গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী দেশীয় ফলের গাছগুলো যেন হারিয়ে না যায়, সে জন্য ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন এলাকায় দেশীয় ফলের চারা রোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাতাবি লেবু, কদবেল, ডেউয়া, আমড়া, জাম, কাঁঠালসহ নানা দেশীয় ফলের গাছ মানুষের বাড়ির আঙিনা, রাস্তার পাশে ও বিভিন্ন খোলা জায়গায় রোপণ করা হচ্ছে।
শুধু চারা রোপণ করলেই হবে না, এসব গাছের নিয়মিত পরিচর্যা ও সংরক্ষণও নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে দেশীয় ফলের গাছ রোপণ ও সংরক্ষণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। আমরা চাই, আমাদের নতুন প্রজন্ম দেশীয় ফলের স্বাদ ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হোক। একই সঙ্গে এসব গাছ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, পুষ্টির চাহিদা পূরণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
জেলা কৃষি বিভাগের উদ্যোগ
ফরিদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাহাদুজ্জামান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমির ব্যবহার পরিবর্তন এবং বিদেশি ফলের বাড়তি চাহিদার কারণে দেশীয় ফলের উৎপাদন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। কৃষকদের উৎসাহিত করা, উন্নত জাতের চারা সরবরাহ, বাগান স্থাপনে পরামর্শ এবং আধুনিক চাষাবাদ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বাড়ির আঙিনা, পুকুরপাড় ও পতিত জমিতে দেশীয় ফলের গাছ লাগাতে কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। পরিচর্যা, রোগবালাই দমন ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা বিষয়েও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
কৃষি কর্মকর্তা বলেন, দেশীয় ফল পুষ্টির পাশাপাশি গ্রামীণ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। তাই এগুলো সংরক্ষণকে কৃষি, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখতে হবে।
অন্যদিকে আমের মতো লাভজনক ফলের বাগান কৃষকের আয় বাড়াতে পারে। তবে গ্রামীণ পরিবেশ ও দেশীয় ফলের ঐতিহ্য রক্ষায় বাতাবি লেবু, কদবেল, ঢেউয়া, ডালিমসহ অন্যান্য ফলের গাছও সংরক্ষণ জরুরি।
বাড়ির আঙিনা, পুকুরপাড় ও জমির আইলে পরিকল্পিতভাবে দেশীয় ফলের গাছ লাগানো হলে পারিবারিক পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি স্থানীয় সরবরাহও বাড়বে। বাণিজ্যিক ফলের পাশাপাশি এসব গাছ টিকিয়ে রাখা গেলে আগামী প্রজন্ম নিজেদের গ্রামের গাছেই ফিরে পাবে দেশীয় ফলের পরিচিত স্বাদ ও সৌন্দর্য।

