
যানবাহন ও তীব্র জনবলসংকটে ধুঁকে ধুঁকে চলছে পাবনা জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কার্যক্রম। জেলার ৯টি উপজেলা ও ১১টি থানায় মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার জন্য জেলা কার্যালয়ের হাতে রয়েছে মাত্র একটি গাড়ি। এ সংকটের কারণে জেলাজুড়ে মাদক চোরাচালান প্রতিরোধ ও নিয়মিত ঝটিকা অভিযান পরিচালনায় ব্যাপক হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্মকর্তাদের। অনেক সময় ভাড়া করা যানবাহনের ওপর নির্ভর করেই অভিযান পরিচালনা করতে হচ্ছে তাদের।
ডিএনসি পাবনা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলা কার্যালয়ের অধীনে সদর ও ঈশ্বরদী—দুটি সার্কেল রয়েছে। জেলার নয়টি উপজেলা ও ১১টি থানায় মাদকবিরোধী অভিযান, মাদকদ্রব্য উদ্ধার, মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার এবং মামলা পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছেন এসব সার্কেলের কর্মকর্তারা। কিন্তু এত বড় এলাকায় অভিযান পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত যানবাহন না থাকায় মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে নানা সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।
একটি গাড়ি থাকায় কোনো একটি সার্কেলের কর্মকর্তারা অভিযানে বের হলে অন্য সার্কেলের কর্মকর্তা কিংবা জেলা কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের যাতায়াতে সমস্যায় পড়তে হয়। জরুরি অভিযান পরিচালনার প্রয়োজন হলেও অনেক সময় গাড়ির ব্যবস্থা করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অভিযানের সুযোগ ও কার্যকারিতা—দুটিই ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ডিএনসির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পাবনার নয়টি উপজেলা ও ১১টি থানায় আমাদের কার্যক্রম। কিন্তু এত বড় এলাকায় একটি গাড়ি দিয়ে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা খুবই কঠিন। একটি দল অভিযানে গেলে অন্যদের বসে থাকতে হয় বা বিকল্প যানবাহনের ব্যবস্থা করতে হয়।
তিনি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে পরিচালনা করতে হয়। আগে থেকে সবকিছু পরিকল্পনা করে করা যায় না। কিন্তু গাড়ির সংকট থাকায় খবর পাওয়ার পরও দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।
ডিএনসি সূত্র বলছে, ডিএনসি জেলা কার্যালয়ে প্রথম শ্রেণির পদ রয়েছে দুটি। এর মধ্যে সহকারী পরিচালকের পদ একটি, যা বর্তমানে শূন্য রয়েছে। ইনস্পেক্টর পদেও রয়েছে জনবলসংকট। জেলা কার্যালয়ের পাশাপাশি ঈশ্বরদী ও সদর সার্কেলের কর্মকর্তাদের সীমিত জনবল দিয়ে জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে।
কর্মকর্তারা জানান, অনেক সরকারি দপ্তরে একাধিক গাড়ি থাকলেও সেগুলো সব সময় মাঠপর্যায়ে ব্যবহার হয় না। অথচ মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মতো একটি সংস্থাকে একটি গাড়ি দিয়ে ১১টি থানার দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। প্রয়োজনীয় গাড়ি ও জনবল পাওয়া গেলে মাদকবিরোধী অভিযান আরও জোরদার করা সম্ভব।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, পাবনা জেলাজুড়ে মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে পাবনা পৌরসভা ও ঈশ্বরদী এলাকায় অনেকটা প্রকাশ্যেই মাদকের বেচাকেনা চলছে। এসব মাদক নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা এবং মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করতে পর্যাপ্ত যানবাহন ও জনবল প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় সক্ষমতা না বাড়ালে মাদক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ফল পাওয়া এবং মাদকমুক্ত জেলা গড়ে তোলা কঠিন হবে।
এদিকে সীমিত জনবল ও যানবাহন নিয়েই চলতি বছরের প্রথম আট মাসে পাবনায় ৭৮৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। এ সময়ে এক হাজার ৩০৯টি অভিযান চালিয়ে ৭৭১টি মামলা করা হয়েছে। অভিযানে হেরোইন, ইয়াবা, গাঁজা, ট্যাপেন্টাডল, ওয়াশ, চোলাইমদ ও তাড়িসহ বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে।
শুধু যানবাহন ও জনবল সংকটই নয়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পাবনা কার্যালয়টিও দীর্ঘদিন ধরে ভাড়া ভবনে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সূত্র জানায়, প্রায় ২০ বছর ধরে ভাড়া ভবনেই দাপ্তরিক কার্যক্রম চলছে। এতে প্রতি মাসে সরকারকে অনেক টাকা ভাড়া দিতে হয়। বর্তমানে পাবনা শহরের কুঠিপাড়ায় অধিদপ্তরের নিজস্ব ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। ভবনটি কবে নাগাদ চালু হবে, তা-ও বলা সম্ভব হচ্ছে না। তবে ভবনটি চালু হলে দাপ্তরিক কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঈশ্বরদী সার্কেলের পরিদর্শক (ইনস্পেক্টর) আব্দুর রহিম এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমাদের এখানে মূল সমস্যা হলো গাড়ির সংকট। একটি গাড়ি দিয়ে পুরো সার্কেলের কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। আসামি গ্রেপ্তারসহ অভিযানে যেতে হলে অনেক সময় ভাড়া করা গাড়ির ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু ভাড়া করে নিয়মিত গাড়ি নিয়ে অভিযান পরিচালনা করা বাস্তবে কঠিন।
তিনি আরও বলেন, জনবলসংকটও রয়েছে। এর সঙ্গে রাজনৈতিক চাপের বিষয়টিও আছে। বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক চাপের কারণে মাদকবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করতে সমস্যায় পড়তে হয়। প্রয়োজনীয় যানবাহন ও জনবল এবং কার্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে মাদকবিরোধী অভিযান আরও জোরদার করা সম্ভব হতো।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর পাবনা কার্যালয়ের উপপরিচালক মাহাম্মদ শহিদুল মান্নাফ কবীর বলেন, জনবল ও যানবাহনসংকটের কারণে আমাদের নিয়মিত অভিযান পরিচালনায় কিছুটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। জেলার ১১টি থানার জন্য পর্যাপ্ত যানবাহন থাকলে মাদকবিরোধী অভিযান আরও বাড়ানো সম্ভব হতো। এতে মাদকসংক্রান্ত মামলা ও গ্রেপ্তারের সংখ্যাও বাড়ত। পাশাপাশি শুধু অভিযান ও গ্রেপ্তার নয়, মাদকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতেও আমরা কাজ করছি। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের মাদক থেকে দূরে রাখতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। মাদক নিয়ন্ত্রণে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন।