logo

লক্ষ্মীপুরে ইজারা নিয়ন্ত্রণে প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্য, হাসিল আদায়ে অনিয়ম

লক্ষ্মীপুরে ইজারা নিয়ন্ত্রণে প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্য, হাসিল আদায়ে অনিয়ম
ছবি: এশিয়া পোস্ট

ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে জমে উঠেছে লক্ষ্মীপুরের কোরবানির পশুর হাট। জেলায় ছয়টি উপজেলায় স্থায়ী-অস্থায়ী মিলিয়ে প্রায় ৯০টি পশুর হাটে প্রতিদিন ভিড় বাড়ছে ক্রেতা-বিক্রেতাদের। কোথাও মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি, কোথাও আবার নজর কাড়ছে বিশাল আকৃতির ষাঁড়।

এদিকে হাটে জমজমাট বেচাকেনার আড়ালে হাসিল আদায়ে অনিয়ম, ইজারা নিয়ন্ত্রণে প্রভাবশালীদের আধিপত্য এবং অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। ফলে খামারিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, অতিরিক্ত হাসিল বন্ধ করা এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনার দাবিও জোরালো হচ্ছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ বলছে, এবার জেলায় কোরবানির পশুর কোনো ঘাটতি নেই। চাহিদা ৮৯ হাজার ২১৫টি হলেও প্রস্তুত রয়েছে ৯৫ হাজার ৪৭৭টি পশু। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় উদ্বৃত্ত রয়েছে ৬ হাজার ২৬২টি পশু। তবে খামারিরা বলছেন, চাহিদার তুলনায় বেশি পশু থাকলেও বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম মিলছে না। গত বছরের তুলনায় অনেক গরু ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা কমে বিক্রি হচ্ছে।

রামগঞ্জ উপজেলার ভাদুর ইউনিয়নের খামারি মো. শাহজাহান প্রায় ১২ বছর ধরে গরু পালন করছেন। এবার তার খামারে ৩৮টি গরু প্রস্তুত করা হয়েছে কোরবানির জন্য। তিনি বলেন, প্রতিটি গরুর পেছনে খাবার, ভুসি, খড়, শ্রমিক সব মিলিয়ে অনেক খরচ হয়েছে। গত বছর যে গরু ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছি, এবার একই ধরনের গরু ৯৫ হাজার টাকার বেশি উঠছে না। তারপরও আশা করছি লোকসান হবে না।

তিনি জানান, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের পরামর্শে নিয়মিত টিকা ও চিকিৎসা করানো হয়েছে। দেশীয় পদ্ধতিতে ঘাস ও খৈল খাইয়ে গরু মোটাতাজা করা হয়েছে। তবে ভারতীয় গরু এলে দেশীয় খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে আশঙ্কা তার।

একই উপজেলার আরেক খামারি নুর ইসলাম বলেন, কোরবানির সময়টাকে ঘিরেই আমাদের বছরের হিসাব। কিন্তু বাজারে যদি দালাল আর অতিরিক্ত হাসিল থাকে, তাহলে খামারিরা ন্যায্য দাম পায় না।

সদর উপজেলার কয়েকটি পশুর হাট ঘুরে বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নির্ধারিত হারের বাইরে অতিরিক্ত হাসিল আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। ছোট গরুর জন্য নির্ধারিত টাকার চেয়ে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে।

কমলনগর থেকে গরু নিয়ে আসা ব্যবসায়ী আবুল কালাম বলেন, সরকার যে হাসিল নির্ধারণ করে দেয়, মাঠে সেটা মানা হয় না। একেক হাটে একেক রকম টাকা নেয়। প্রতিবাদ করলে নানা ঝামেলা হয়।

আরেক বিক্রেতা মো. জসিম বলেন, হাটে জায়গা নেওয়া, গাড়ি ঢোকানো, গরু নামানো সবখানেই আলাদা টাকা লাগে। প্রশাসনের নজরদারি আরও বাড়ানো দরকার।

তবে, কয়েকজন ইজারাদার দাবি করেন, অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই। বাজার পরিচালনা, নিরাপত্তা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় তাদের খরচ বেশি হচ্ছে।

হাটের নিয়ন্ত্রণে প্রভাবশালী ও রাজনৈতিকভাবে পরিচিত ব্যবসায়ীরা

জানা গেছে, জেলার অধিকাংশ বড় পশুর হাট স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিকভাবে পরিচিত ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কয়েকটি উপজেলায় একই গ্রুপের লোকজন একাধিক হাটের ইজারা পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, হাটের ইজারা সাধারণ ব্যবসায়ীরা পায় না। রাজনৈতিক পরিচয় আর প্রভাব না থাকলে টিকে থাকা কঠিন। তবে এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, নিয়ম মেনেই ইজারা দেওয়া হয়েছে। কোনো অনিয়মের অভিযোগ পেলে তদন্ত করা হবে।

টানা বৃষ্টিতে বেচাকেনায় দুর্ভোগ

গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে অনেক হাট কাদায় পরিণত হয়েছে। এতে পশু ওঠানামা এবং বেচাকেনায় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের।

রায়পুর উপজেলার ক্রেতা সাইফুল ইসলাম বলেন, বাজারে প্রচুর পশু আছে। দামও মোটামুটি নাগালের মধ্যে। কিন্তু কাদার কারণে পরিবার নিয়ে হাটে চলাফেরা করতে কষ্ট হচ্ছে।

জেলা পুলিশ জানিয়েছে, জেলার ২০টি স্থায়ী ও ৭০টি অস্থায়ী পশুর হাটে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। জাল টাকা শনাক্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) হোসাইন মো. রায়হান কাজেমী বলেন, হাটে যেন চাঁদাবাজি, জাল টাকা বা গরু চুরির ঘটনা না ঘটে সেজন্য আমরা সতর্ক রয়েছি। কোনো অভিযোগ পেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ কে এম ফজলুল হক বলেন, লক্ষ্মীপুরে পর্যাপ্ত কোরবানির পশু রয়েছে। প্রতিটি হাটে মেডিকেল টিম থাকবে। খামারিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।

জেলা পুলিশ সুপার মো. আবু তারেক বলেন, প্রত্যেকটি পশুর হাটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কাজ করছেন। ক্রেতা-বিক্রেতারা যাতে নিরাপদে বেচাকেনা করতে পারেন, সেজন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসক এস এম মেহেদী হাসান বলেন, মানুষ যেন সুন্দরভাবে ঈদ উদযাপন করতে পারে, সেজন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পশুর হাটে জাল টাকা, অতিরিক্ত হাসিল বা কোনো অনিয়ম হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভ্রাম্যমাণ আদালতও বাজার মনিটরিং করছে।