logo

চাকরির শেষ দিনে বন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ

চাকরির শেষ দিনে বন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ
ডিএফও মো. শফিকুল ইসলাম। ছবি : সংগৃহীত

চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. সফিকুল ইসলামের শেষ কর্মদিবস ছিল আজ মঙ্গলবার (৯ জুন)। তবে বিদায়ের ঠিক আগমুহূর্তে তারিখের হেরফের করে নজিরবিহীন বদলি-বাণিজ্য, পদায়ন জালিয়াতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, সরকারি বিধিমালা উপেক্ষা করে বিভিন্ন রেঞ্জ, বিট ও চেক স্টেশনে পদায়নের নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে, যা ডিএফওর বিদায়ের শেষ মুহূর্তে এসে বাস্তবায়িত হয়েছে।

জানা গেছে, ৯ জুন ডিএফও সফিকুলের চাকরিজীবনের শেষ কর্মদিবস হলেও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে গত ৬ জুন (শনিবার) সরকারি ছুটির দিন একটি বিতর্কিত বদলি আদেশ প্রকাশ করে বন বিভাগ। দাপ্তরিক নথিতে আদেশটি গত ৩ মে ২০২৬ ডকেট বা নথিভুক্ত দেখানো হলেও, মূলত ডিএফওর অবসরের ঠিক তিন দিন আগে তা প্রকাশ্যে আসে।

পূর্ববর্তী তারিখের এই আদেশের নেপথ্যে ডিএফও সফিকুল বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার এক চতুর পরিকল্পনা করেছেন বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া বদলি কমিটির দুই সহকারী বন সংরক্ষককে (এসিএফ) চাপ দিয়ে তিনি এই ফাইলে স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে বন বিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছে।

নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম বন বিভাগের দাপ্তরিক নথিতে হাটহাজারী রেঞ্জের ডেপুটি রেঞ্জার মো. সাইফুল ইসলামকে শহর রেঞ্জে এবং বিভাগীয় দপ্তরের ডেপুটি রেঞ্জার আইয়ুব আলীকে বদলির আদেশ দেওয়া হয়। এতে সই করেন সফিকুল ইসলা। আদেশে ৩ মের ডকেট বা নথিভুক্ত দেখানো হলেও দপ্তরের সিলে তারিখ উল্লেখিত ছিল ৬ জুন। অর্থাৎ ব্যাকডেটেড আদেশ জারি করতে গিয়ে নথিতে পেছনের তারিখ উল্লেখ করলেও সিলমোহরে সেটি ৬ জুন উল্লেখ থেকে যায়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এভাবে নিয়মবহির্ভূত আদেশ কার্যকর করা হলে মাঠপর্যায়ে একটি অত্যন্ত খারাপ নজির সৃষ্টি হবে। এতে একদিকে যেমন প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হবে, তেমনি বন বিভাগের সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হবে; যা পরবর্তী বিভাগীয় বন কর্মকর্তার জন্য বড় ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করবে।

বন বিভাগের সূত্রের দাবি, সফিকুলের দায়িত্ব পালনের পুরো সময়ে আকর্ষণীয় ও লাভজনক বিট এবং চেক স্টেশনে পদায়নের জন্য চার লাখ থেকে শুরু করে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়েছে। ডিএফওর নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটকে ‘মাসোহারা’ দিলেই কেবল মিলছে পছন্দসই ও আরামদায়ক পদায়ন। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বদলির আদেশ হওয়ার পরও রিলিজ (অব্যাহতি) না নিয়ে অনৈতিকভাবে আগের কর্মস্থলেই বহাল থাকছেন কতিপয় কর্মকর্তা।

ডিএফওর অবসরের আগেই কে কোন রেঞ্জে বসবেন, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তার একটি গোপন তালিকা চূড়ান্ত হয়েছে, যাকে প্রশাসনের ভেতরেই অনেকে ‘রেঞ্জ বিক্রি’ বা নিলাম বলে অভিহিত করছেন।

বন বিভাগ-সংশ্লিষ্টদের মাঝে বেশ কিছুদিন ধরেই গুঞ্জন চলছিল, চট্টগ্রাম সার্কেলের হাটহাজারী রেঞ্জ কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামকে ‘শহর রেঞ্জ কর্মকর্তা’ এবং আইয়ুব আলীকে ‘হাটহাজারী রেঞ্জ কর্মকর্তা’ করা হচ্ছে। এই অনিয়ম নিয়ে এর আগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত হয়।

অবশেষে সেই গুঞ্জনেরই প্রতিফলন ঘটল গত ৬ জুন। সরকারি ছুটির দিনে প্রকাশিত ওই বিতর্কিত বদলির আদেশে দেখা যায়, গত ৩ মের ব্যাকডেটেড আদেশে সাইফুল ইসলামকে শহর রেঞ্জ এবং আইয়ুব আলীকে হাটহাজারী রেঞ্জে পদায়ন করা হয়েছে।

তারিখের হেরফের করা নজিরবিহীন বদলির আদেশ
তারিখের হেরফের করা নজিরবিহীন বদলির আদেশ

ফলে প্রশ্ন উঠেছে, আদেশটি যদি ৩ মের হয়েই থাকে, তবে তা প্রকাশ করতে অবসরের ঠিক তিন দিন আগে পর্যন্ত কেন গোপন রাখা হলো? বন বিভাগের চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের দোতলা থেকে নিচতলায় আদেশটি পৌঁছাতে কি এক মাস সময় লেগেছে? সচেতন মহলের মতে, এটি স্পষ্ট প্রতীয়মান যে অবসরে যাওয়ার প্রাক্কালে বড় অঙ্কের আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে এই পদ-বাণিজ্য করা হয়েছে।

তবে বিদায়ী ডিএফওর এমন ব্যাকডেটেড অফিস আদেশ কার্যকর করার পরও চট্টগ্রামের বন সংরক্ষক (সিএফ) মিহির কুমার দোর নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রেঞ্জ কর্মকর্তা এশিয়া পোস্টকে বলেন, গত বেশ কিছুদিন ধরে টাকার বিনিময়ে এই পদায়ন ও বদলি-বাণিজ্য হচ্ছে বলে শুনেছি। এই বদলির ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা করে লেনদেন হয়েছে। জানতে চাইলে এর বেশি কিছু বলতে রাজি হননি তিনি।

অভিযোগ বিষয়ে জানতে ডিএফও মো. সফিকুল ইসলামের মুঠোফোন নম্বরে কল করা হলে তিনি সাড়া দেননি। পরে মঙ্গলবার দুপুরের পর এই প্রতিবেদক তার কার্যালয়ে গেলে তার সহকারী জানান, তিনি অফিসে নেই। তবে ওই সময় তিনি অফিসেই ছিলেন বলে কার্যালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে। ওই সময় তার মুঠোফোনে আবার কল করা হলে নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।

চট্টগ্রাম সার্কেলের সদরের সহকারী বন সংরক্ষক খান মো. আবরারুর রহমান এই নিয়োগ কমিটিতে ছিলেন। আদেশে দুটি ভিন্ন তারিখ এবং তাদের কাছ থেকে চাপ প্রয়োগ করা স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে, এমন অভিযোগের বিষয় উল্লেখ করে তার মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অফিসিয়াল সিক্রেসি আইন অনুযায়ী এই বিষয়ে আপনার সঙ্গে আমার কথা বলার সুযোগ নেই। আমি এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’

ডিএফওর বিদায়ের আগে বন বিভাগের এমন প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম ও জালিয়াতির ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বন ও পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের কর্মী এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা।

তারা অনতিবিলম্বে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানিয়েছেন।