logo
Advertisement

চুয়াডাঙ্গা/লাইসেন্স নবায়ন নেই ১৩৬টির, তবুও চলছে চিকিৎসা

এশিয়া পোস্ট নিউজ
এশিয়া পোস্ট নিউজ
চুয়াডাঙ্গা, খুলনা
লাইসেন্স নবায়ন নেই ১৩৬টির, তবুও চলছে চিকিৎসা
চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে অবস্থিত মনোয়ারা সনো সেন্টার অ্যান্ড নার্সিং হোম। ছবি : এশিয়া পোস্ট

চুয়াডাঙ্গায় লাইসেন্সবিহীন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ছড়াছড়ি। জেলার চার উপজেলায় অনলাইনে নিবন্ধিত বা লাইসেন্সপ্রাপ্ত ১৮৪টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে বর্তমানে ১৩৬টিরই লাইসেন্স নবায়ন করা নেই। প্রায় তিন বছর ধরে এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন না হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন জেলার সাধারণ মানুষ।

অভিযোগ রয়েছে, এসব ক্লিনিকে অপচিকিৎসার কারণে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। অন্যদিকে, ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর ভুল বা ত্রুটিপূর্ণ প্রতিবেদনের কারণে রোগীরা পড়ছেন নানা ভোগান্তিতে। অথচ বিষয়গুলো যথাযথভাবে তদারকির ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য বিভাগের কার্যকর উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

চুয়াডাঙ্গা জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, জেলায় অনলাইনে নিবন্ধিত বা লাইসেন্সপ্রাপ্ত মোট ১৮৪টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে ১৩৬টিরই প্রায় তিন বছর ধরে লাইসেন্স নবায়ন করা নেই।

লাইসেন্স নবায়ন না থাকা প্রাইভেট ক্লিনিকের মধ্যে চুয়াডাঙ্গা সদরে ১৭টি, আলমডাঙ্গায় ১০টি, দামুড়হুদায় ৬টি এবং জীবননগরে ১০টি রয়েছে। অন্যদিকে, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে চুয়াডাঙ্গা সদরে ৩৯টি, আলমডাঙ্গায় ২১টি, দামুড়হুদায় ১৫টি এবং জীবননগরে ১৮টির লাইসেন্স নবায়নহীন অবস্থায় রয়েছে।

মূলত পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও নারকোটিক্সের ছাড়পত্র না থাকা, নীতিমালার চরম লঙ্ঘন এবং বিভিন্ন অনিয়ম ও অবৈধতার কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন আটকে রয়েছে। এর মধ্যেই নতুন লাইসেন্স পাওয়ার জন্য আরও চারটি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছে।

এদিকে, চুয়াডাঙ্গা পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় পরিবেশগত ছাড়পত্র পাওয়ার জন্য মোট ১৬২টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার আবেদন করেছে। এর মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর মাত্র ৩৭টি প্রতিষ্ঠানকে শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ছাড়পত্র দিতে পেরেছে। আরও ছয়টি আবেদনের ফাইল প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বাকি ১১৯টি প্রতিষ্ঠানই ছাড়পত্র পাওয়ার অযোগ্য।

এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশের ফাইল দীর্ঘদিন ধরে ‘ঘাটতি কাগজপত্র জমাদানের নোটিশ’ কিংবা ‘ডিওউচ/চিকিৎসা-বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণের চিঠি’র পর্যায়ে ঝুলে রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ভাষ্যমতে, শর্ত ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ছাড়পত্র পাওয়ার যোগ্য নয়। একই সঙ্গে তারা নিয়ম মেনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণও করছে না।

চুয়াডাঙ্গা পরিবেশ অধিদপ্তর জেলা কার্যালয়ের সিনিয়র কেমিস্ট নরেশ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, চুয়াডাঙ্গা জেলায় আমাদের তালিকাভুক্ত মোট ১৬২টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। এর মধ্যে এ পর্যন্ত ৩৭টি প্রতিষ্ঠানকে পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, উদ্যোক্তারা সময়মতো প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা না দেওয়ায় অনেক আবেদন যথাসময়ে প্রক্রিয়াকরণ করা সম্ভব হয় না। ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোও সময়মতো পরিবেশগত ছাড়পত্র পাচ্ছে না। মূলত উদ্যোক্তাদের গাফিলতির কারণেই এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে।

চিকিৎসা-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে নরেশ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, চিকিৎসা-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০০৮ অনুযায়ী যেসব নির্দেশনা ও শর্ত রয়েছে, অনেক প্রতিষ্ঠান সেগুলো যথাযথভাবে পরিপালন করছে না। ফলে তাদের পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে যেসব প্রতিষ্ঠান চিকিৎসা-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয় শর্ত যথাযথভাবে পূরণ করছে, তাদের নিয়ম অনুযায়ী যথাসময়ে পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে, লাইসেন্স না থাকা এবং অভিযান প্রসঙ্গে চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়া উদ্দীন আহমেদ বলেন, চুয়াডাঙ্গা জেলায় বর্তমানে অনলাইন লাইসেন্সপ্রাপ্ত ক্লিনিকের সংখ্যা ৬৪টি এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ১২০টি।

লাইসেন্স নবায়ন না হওয়ার কারণ ও চলমান পদক্ষেপ সম্পর্কে ডা. হাদী জিয়া উদ্দীন বলেন, পরিবেশের ছাড়পত্র না থাকায় এসব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স নবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে তাদের নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময় অতিক্রম করার পর আমরা ধারাবাহিকভাবে ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে অভিযান পরিচালনা করছি। ইতোমধ্যে আলমডাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা সদর ও জীবননগর উপজেলায় অভিযান চলমান রয়েছে। খুব দ্রুতই নিয়ম না মানা ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্বাস্থ্য বিভাগের এই ঢিলেঢালা ভাব ও তদারকির অভাবে চরম ক্ষোভ ও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকেরা।

স্বাস্থ্য বিভাগের নজিরবিহীন উদাসীনতা ও প্রশাসনিক ঢিলেঢালা ভাবকেই চুয়াডাঙ্গা জেলায় অবৈধ চিকিৎসা বাণিজ্যের মূল হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, প্রায় দুই বছর ধরে শত শত প্রতিষ্ঠানের না আছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বৈধ লাইসেন্স, না আছে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিবেশগত ছাড়পত্র। তবুও এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কার্যকর বা স্থায়ী কোনো অভিযান নেই।

বছর ঘুরে দু-একটি প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্য বিভাগ ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পক্ষ থেকে ‘লোকদেখানো’ অভিযান চালানো হলেও কোনো ধরনের শর্ত বা কাগজপত্র পূরণ না করেই কয়েক দিনের মধ্যে রহস্যজনকভাবে সেসব প্রতিষ্ঠান আবারও খুলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

বর্তমানে চুয়াডাঙ্গায় স্বাস্থ্য বিভাগের অভিযানে বন্ধ হওয়া একটি প্রতিষ্ঠানও খুঁজে পাওয়া যাবে না বলে দাবি স্থানীয়দের। নামকাওয়াস্তে কয়েকটি অভিযানে বন্ধ দেখানো সব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারই বহাল তবিয়তে চালু রয়েছে বলে অভিযোগ।

অভিযোগ উঠেছে, অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে মানুষ মেরে ফেলার মতো ঝুঁকিপূর্ণ এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছেন না স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়া উদ্দীন প্রতি মাসেই গড়পড়তা এক মাসের সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার ঘোষণা দেন। কিন্তু তিন বছর পার হয়ে গেলেও যেন সিভিল সার্জনের সেই এক মাসের সময়সীমা শেষ হচ্ছে না।

এমনকি গত আগস্ট মাসে জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায় জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার অবৈধ ক্লিনিক নিয়ে সিভিল সার্জনকে প্রশ্ন করলে তিনি আগস্ট মাস পর্যন্ত সময় দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। অথচ আগস্ট পার হয়ে ৯ সেপ্টেম্বর গড়ালেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

ফলে সরকারি লাইসেন্স ছাড়াই অবৈধ প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আর প্রতিনিয়ত ভুল চিকিৎসা ও ভুল রিপোর্টের শিকার হয়ে চুয়াডাঙ্গার সাধারণ মানুষ চরম ক্ষতি ও প্রাণসংশয়ের মধ্যে পড়ছেন।