logo
Advertisement

বটগাছের শীতল ছায়ায় শত বছরের ঐতিহ্য মহিষের ‘টক দই’

এশিয়া পোস্ট নিউজ
এশিয়া পোস্ট নিউজ,জামালপুর
বটগাছের শীতল ছায়ায় শত বছরের ঐতিহ্য মহিষের ‘টক দই’
ছবি : এশিয়া পোস্ট

দুপুর গড়িয়ে বিকেল, নরম আলো ধীরে ধীরে মাটিতে ছড়িয়ে পড়ছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় কোনো গ্রামীণ আড্ডা বসেছে বিশাল এক বটগাছের নিচে। কিন্তু কাছে গেলেই বোঝা যায় বিশাল এক বটগাছের ছায়ায় জমে উঠেছে এক অন্যরকম জনসমাগম। সারি সারি মাটির হাঁড়ি, আর প্রতিটি হাঁড়িতে জমে থাকা ঘন সাদা দই, কেউ হাঁড়ির ঢাকনা খুলে দেখছেন, কেউ আঙুলে একটু ছুঁয়ে নিচ্ছেন ঘন সাদা দই।

Advertisement

এই চিত্র জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার শহর থেকে সাত কিলোমিটার দূরে সীমান্তবর্তী নঈম মিয়ার বিশাল হাটের। পুরোপুরি সনাতন পদ্ধতিতে ঘরেই তৈরি হয় এই টক দই। প্রায় শত বছরের পুরোনো এই দইয়ের ঐতিহ্য আজও এ জনপদের স্বাদ-সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতীক হয়ে টিকে আছে।

সপ্তাহের প্রতি শনি ও মঙ্গলবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে এই হাট। হাটের ঠিক পূর্ব পাশে ঈদগাহ মাঠের বটগাছের নিচে সারি ধরে বসেন দই বিক্রেতারা। তাদের সামনে সাজানো থাকে মাটির হাঁড়ি। সেই দই কিনতে জেলা ও জেলার বাইরের ক্রেতারা ভিড় জমান এই হাটে। দরদাম শেষে, দইয়ের ঘনত্ব ও স্বাদ পরীক্ষা চলে। তারপর যে যার মতো দই কিনে নিয়ে যান ক্রেতারা।

এই দই তৈরির গল্পটাও ভিন্নরকম। এখানে দই তৈরির জন্য নেই কোনো আধুনিক যন্ত্র, থাকে না কোনো কৃত্রিম উপাদান।

প্রথমে মহিষের তাজা দুধ সংগ্রহ করে মাটির হাঁড়িতে ঢেলে রেখে দেওয়া হয়। গরুর দুধের মতো মহিষের দুধ দীর্ঘক্ষণ আগুনে জ্বাল দেওয়ার বা আলাদা করে দইয়ের বীজ মেশানোর প্রয়োজন হয় না। প্রাকৃতিকভাবেই তিন দিনে দুধ জমে হয়ে ওঠে টক দই। মহিষের দুধের ঘনত্ব আর ফ্যাটই এই জাদুর রহস্য।

প্রতিটি হাঁড়িতে ২ থেকে ১৫ কেজি পর্যন্ত দই বসানো যায়। প্রতি কেজি দই উৎপাদনে এক লিটারের কিছুটা বেশি দুধের প্রয়োজন হয়। প্রতিটি মহিষ থেকে ৪ থেকে ১০ লিটার পর্যন্ত দুধ পাওয়া যায়। আর এই দইয়ের দামও খুব বেশি নয়, প্রতি কেজি ১৬০ থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি হয়ে থাকে। স্বাভাবিকভাবে এই টক দইয়ের গুণগত মান এক সপ্তাহ পর্যন্ত বজায় থাকে।

এ অঞ্চলের মানুষের খাদ্যসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে এই দই। এটি ভাতের সঙ্গে খাওয়া হয়, চিড়া-মুড়ির সঙ্গে মিশিয়ে তৈরি হয় মুখরোচক খাবার, আবার গরমের দিনে দই, পানি ও চিনি মিশিয়ে তৈরি করা হয় ঘোল, যা শরীরকে শীতল রাখে। ভাতের সঙ্গে দই ও খেজুরের গুড় এ অঞ্চলের জনপ্রিয় একটি খাবার। এ অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় থাকে এই দই । অতিথি আপ্যায়ন থেকে শুরু করে বিয়ে-শাদী, উৎসব সবখানেই এর উপস্থিতি অনিবার্য। এ দই ছাড়া যেন এ অঞ্চলের কোনো উৎসব পূর্ণতা পায় না।


বকশীগঞ্জে এখন অনেক পরিবারই মহিষ লালনপালনের দিকে ঝুঁকছে। খামারের বদলে গ্রামীণ পরিবেশেই স্বাভাবিকভাবে বড় করা হয় মহিষ। আর সেখান থেকেই আসে এই দইয়ের মূল উপকরণ উৎকৃষ্ট মানের দুধ।

হাটের এক কোণে দাঁড়িয়ে নাতিকে সঙ্গে নিয়ে দই বিক্রি করতে আসছেন ষাটোর্ধ্ব আব্দুর রহমান, কথা হয় তার সঙ্গে। এ সময় তিনি বলেন, প্রায় ৩৫ বছর ধরে আমি এহানে (এখানে) দই বেচি (বিক্রি) করি। আমাদের দই এহন দেশের বিভিন্ন জায়গায় যায়। আগে শুধু এলাকার মানুষ এই দই কিনতো, এহন দূর থেকেও মানুষ আহে (আসে)। দই বেচতেও বেশি সময় লাগে না। আগে তো আমরা কয়েকজন মানুষ বেচতাম (বিক্রি করতাম), এখন দেখেন বাজারে কত মানুষ দই বেচে (বিক্রি করে)। আবার বেচাও হয়ে যাইতাছে।

বকশীগঞ্জ শহর থেকে দই কিনতে আসা রনি মিয়া বলেন, আমি প্রায় প্রতি সপ্তাহেই এখানে আসি। একবার এসে কয়েক কেজি দই কিনে নিয়ে যাই। ভাত, চিড়ার সঙ্গে এই দই খেয়ে থাকি। এই দই খুব সুস্বাদু। তাই বারবার আসতে হয়।

জামালপুর শহর থেকে থেকে দই কিনতে আসছেন নাহিদ হাসান, তিনি বলেন, শুধু দই কিনতে না, এটা দেখতেও আসা হয়েছে। শুধু নাম শুনছি দই এর হাট বসে, বাস্তবে দেখা হয়নি। আজকে বাস্তবে দেখে গেলাম, কিনে নিয়েও গেলাম।