সঠিক সময়ে ব্যাহত সরবরাহ, ব্যবসা কমছে বিএডিসির

সঠিক সময়ে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) কাছ থেকে ফসলের বীজ পান না কৃষকরা। সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় কৃষকরা ঝুঁকছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দিকে। সংকুচিত হয়ে আসছে বিএডিসির ব্যবসা। কৃষিনির্ভর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলা কুমিল্লায় গত পাঁচ বছরে বিএডিসি থেকে বীজ বিক্রি কমেছে প্রায় ১৬ শতাংশ।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি বীজের বিক্রি কমে যাওয়ায় রাজস্ব কমছে। মজুত ব্যবস্থাপনায় ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সরকারি বীজের বাজার সংকুচিত হয়ে বেসরকারি কোম্পানির বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
বিএডিসি বলছে, সরকারি বীজের সরবরাহকে দায়ী করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। কৃষকের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া, ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়া, শ্রমিক সংকট, বীজের দাম এবং জলবায়ু ও আবহাওয়ার ঝুঁকি–এসব কারণে কৃষকের একটি অংশ চাষাবাদ কমিয়ে দিচ্ছেন। সামগ্রিকভাবেই বীজের চাহিদা কমছে।
কুমিল্লায় গত পাঁচ বছরের চিত্র
কুমিল্লায় গত পাঁচ বছরে বিএডিসির বিভিন্ন ফসলের বীজ বিক্রি কমেছে এক হাজার ৭০৮ দশমিক ৭৯৪ মেট্রিক টন। হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে বিভিন্ন ফসলের বীজ বিক্রি হয় ১০ হাজার ৭১০ দশমিক ২৯১ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা কমে ১০ হাজার ৫৭ দশমিক ৭৮৮ টনে দাঁড়ায়।
এর পর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিক্রি কিছুটা বেড়ে ১০ হাজার ৬৬২ দশমিক ৬৯০ টন হলেও পরের বছর আবার কমে যায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিক্রি হয় ১০ হাজার ৩০০ দশমিক ২৯৭ টন। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে আসে ৯ হাজার ১ দশমিক ৪৯৭ টনে। ২০২১-২২ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিএডিসির বীজ বিক্রি কমেছে ১ হাজার ৭০৮ দশমিক ৭৯৪ টন। অর্থাৎ পাঁচ বছরে বিক্রি কমেছে প্রায় ১৬ শতাংশ।
ফসলভিত্তিক হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বীজের বিক্রিতে উল্লেখযোগ্য পতন দেখা গেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমন ধানের বীজ বিক্রি হয়েছিল দুই হাজার ১৩৮ দশমিক তিন টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে এক হাজার ৯৮৪ দশমিক ৩৬৫ টন এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আরও কমে দাঁড়ায় এক হাজার ৩২২ টনে।
আলুবীজের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আলুবীজ বিক্রি হয়েছিল তিন হাজার ২৯৪ দশমিক ৬১৬ টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিক্রি কমে দুই হাজার ২৫২ দশমিক ১৮২ টন এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে আসে এক হাজার ৭১৪ দশমিক ৩৬৬ টনে।

অভিযোগ ও জবাব
কৃষকরা বলছেন, চাহিদার সময় সরকারি বীজ বাজারে না থাকলে সেই ঘাটতি পূরণ করছে বেসরকারি কোম্পানিগুলো। এতে কৃষক তাৎক্ষণিক চাষাবাদ চালিয়ে যেতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে সরকারি বীজের বাজার সংকুচিত হয়ে পড়ছে
কৃষক নাফিজুর বলপন বলেন, বিএডিসির বীজ সময়মতো না ছাড়লে কৃষক অপেক্ষা করতে পারেন না। তখন কোম্পানির বীজ কিনেই চাষ করতে হয়। এতে বেসরকারি কোম্পানির বীজের বাজার বাড়ছে।
কৃষক কবির হোসাইন বলেন, কৃষকের জন্য ভালো মানের দেশি বীজ কম দামে ও সময়মতো পাওয়া নিশ্চিত করা দরকার। সরকারি বীজের বাজার কমে গেলে বেসরকারি কোম্পানিগুলো সেই জায়গা দখল করবে।
তবে বীজ বিক্রি কমার পেছনে কৃষির সামগ্রিক পরিস্থিতির প্রভাব দেখছেন বিএডিসি কুমিল্লার উপপরিচালক (বীজ বিপণন) নিগার হায়দার। তিনি বলেন, কৃষক উৎপাদিত ফসলের লাভজনক দাম পাচ্ছেন না। উৎপাদন খরচ বেড়েছে। শ্রমিক সংকট রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও আবহাওয়ার ঝুঁকিও বেড়েছে। এসব কারণে অনেক কৃষক কৃষিকাজ থেকে সরে যাচ্ছেন।
নিগার হায়দার বলেন, কৃষিতে লাভ কমে গেলে চাষের পরিমাণও কমে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বীজের চাহিদায়। বীজের দামও কৃষকের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। নগর এলাকায় অনেকের কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ততা এখন ছাদবাগান কিংবা সীমিত পরিসরে সবজি চাষের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে আসছে। বড় পরিসরে কৃষিজমিতে চাষ কমে যাওয়ায় বীজের বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে।



