সড়ক ও সেতুর অভাবে বিয়ে হয় না, অভিযোগ এলাকাবাসীর

রাস্তার কারণে ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ায় সমস্যা হচ্ছে, এমনকি আমাদের ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। ছেলে-মেয়ে সুন্দর হলেও লোকজন এসে রাস্তা দেখে ফেরত চলে যায়। তারা বলেন—ওই এলাকার রাস্তা ভালো না, ওখানে বিয়ে করানো যাবে না। আমাদের গ্রামে এখনও অনেক প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়ে ঘরে বসে আছে।
আক্ষেপের সুরে কথাগুলো বলছিলেন জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার জোড়খালী ইউনিয়নের ভেলামারী গ্রামের বাসিন্দা স্বপ্না বেগম। তার মতো একই অভিযোগ এই উপজেলার মৃধাপাড়া, গুনারিতলা ও মোল্লাপাড়া গ্রামের অনেক পরিবারের।
স্থানীয়দের দাবি, একটি ভাঙা সেতু ও জরাজীর্ণ সড়কের কারণে বছরের পর বছর ধরে অবহেলিত হয়ে রয়েছেন এই অঞ্চলের বাসিন্দারা। জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার জোড়খালী ইউনিয়নের ভেলামারী, মৃধাপাড়া, গুনারিতলা ও মোল্লাপাড়া গ্রামের প্রায় ১২ হাজার মানুষ দীর্ঘ সাত বছর ধরে একটি ভাঙা সেতুর কারণে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। ২০১৯ সালের বন্যায় ঝাড়কাটা নদীর একটি উপশাখার ওপর নির্মিত সেতুটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর সেটি আর সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ করা হয়নি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সেতুর দুই পাশ থেকে মাটি সরে গিয়ে সংযোগ সড়ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। মাঝখানের অংশ ভেঙে নিচের দিকে হেলে পড়েছে। সেতুর দুই পাশে কাঁচা সড়ক থাকলেও মাঝখানে সংযোগ না থাকায় পুরো সড়কটিই কার্যত অচল। শুষ্ক মৌসুমে সেতুর দুই ধার শুকিয়ে গেলেও মাঝখানে পানি জমে থাকে। ফলে স্থানীয়রা পাশের সরু মাটির পথ দিয়ে কোনো রকমে হেঁটে বা মোটরসাইকেলে চলাচল করেন। তবে ভারী যানবাহন চলাচল একেবারেই বন্ধ। আর বর্ষা এলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে; পথঘাট পানিতে ডুবে যায়, বাড়ে ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা। কিছু সময়ের জন্য কোনো যানবাহন পাওয়া গেলেও দিতে হয় দ্বিগুণ ভাড়া।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সেতুটি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে প্রতিদিন উপজেলা সদরে যেতে প্রায় ৪ থেকে ৬ কিলোমিটার পথ ঘুরে যেতে হয়। জোড়খালী ইউনিয়নের চার গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকার বাসিন্দারা এই পথে যাতায়াত করেন। এতে সময় যেমন বেশি লাগছে, তেমনি বাড়ছে যাতায়াত খরচও।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে এই অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা। চারটি মাদ্রাসা, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম এই সড়কটি। সেতুটি ভেঙে যাওয়ায় প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার পথ ঘুরে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যেতে হচ্ছে।
স্থানীয় একটি মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ সাত বছর ধরে আমাদের ব্রিজটা ভেঙে পড়ে আছে, কেউ এসে খোঁজখবর নেয় না। আমাদের প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার পথ ঘুরে যেতে হয়। মাঝেমধ্যে দেখা যায় শিক্ষার্থীরা সঠিক সময়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে পারে না। সরকারের কাছে অনুরোধ, যাতে আমাদের ব্রিজটা দ্রুত ঠিক করে দেওয়া হয়।
স্থানীয় শিক্ষক হাফিজুর রহমান বলেন, আমাদের এলাকা কতটা বঞ্চিত আর অবহেলিত, তা মুখে বলে বোঝানো যাবে না। আমরা এই রাস্তা আর ব্রিজের কারণে ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দিতে পারছি না। অনেক সময় বিয়ের প্রস্তাব এলে রাস্তার কারণে তারা না করে দেয়। ছেলের বিয়ে দিতে গেলে বলে ওই এলাকার রাস্তা ভালো না, ওখানে মেয়ে বিয়ে দেওয়া যাবে না। আবার মেয়ের বিয়ে দিতে গেলে ছেলেপক্ষ বলে ওই এলাকার রাস্তা ভালো না, ওখানে বিয়ে করাব না। বিশেষ করে সন্তান বিয়ে দিতে গিয়ে আমরা যে কী যন্ত্রণার শিকার হচ্ছি, তা বলে বোঝানো যাবে না।
আলিয়া বেগম নামে এক বাসিন্দা বলেন, নদীর ওই পাশে আমরা চাষাবাদ করি, কিন্তু সেতু না থাকায় ফসল ঘরে তুলতে পারি না। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের মাদ্রাসায় ভর্তি করেছি, কিন্তু তাদের আসা-যাওয়ার খুব সমস্যা হয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় গর্ভবতী মায়েদের নিয়ে। প্রসববেদনা উঠলে কোনো গাড়ি পাওয়া যায় না, রাস্তার খারাপ অবস্থার কারণে যথাসময়ে ডাক্তারও পাওয়া যায় না। অনেক সময় রাস্তাতেই গর্ভবতী মা মারা যান।
হুমায়ূন কবির নামে আরেকজন বলেন, ব্রিজের ওপারে দুটি গোরস্তান আছে। ব্রিজের অভাবে আমরা গোরস্তানে যেতে পারি না। আমাদের যাতায়াতের খুবই সমস্যা। ছেলে-মেয়েরা ঠিকমতো স্কুলে যেতে পারে না, বৃষ্টি এলে চলাচল একবারে বন্ধ হয়ে যায়।
এ বিষয়ে মাদারগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সুমন চৌধুরী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বরাতে আমি জানতে পেরেছিে, ব্রিজটি ২০১৯ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এর ফলে দুটি ইউনিয়ন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আমি আরও দেখেছি যে স্থানীয়রা এই দাবিতে মানববন্ধন করেছেন। আমি আমাদের জেলা প্রশাসকের সমন্বয় সভায় বিষয়টি উত্থাপন করব এবং দ্রুত সমাধানের জন্য অনুরোধ জানাব।
