ফেনী জেলা বিএনপি/৩ মাসের আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে ৭ বছর পার

তিন মাসের কথা বলে গঠন করা হয়েছিল ফেনী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি। কিন্তু দেখতে দেখতে পার হয়ে গেছে দীর্ঘ সাতটি বছর। দীর্ঘ এই সময়েও আহ্বায়ক কমিটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি, এমনকি নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রেও দেখা মেলেনি কার্যকর কোনো অগ্রগতির। এতে দলটির নেতা-কর্মীদের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, ফেনী জেলা বিএনপির মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে দীর্ঘ ১০ বছর পর ২০১৯ সালের ২ অক্টোবর ৪৬ সদস্যবিশিষ্ট একটি আহ্বায়ক কমিটি প্রকাশ করা হয়। ওই কমিটিতে জেলা বিএনপির সাবেক প্রচার সম্পাদক শেখ ফরিদ বাহারকে আহ্বায়ক ও তৎকালীন ফেনী পৌর বিএনপির সভাপতি আলাল উদ্দিন আলালকে সদস্যসচিব করা হয়। দলটির তৎকালীন কেন্দ্রীয় সহ-দপ্তর সম্পাদক বেলাল আহমেদ স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নতুন আহ্বায়ক কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।
উক্ত কমিটিতে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে সম্মানিত সদস্য এবং এম এ খালেক, গাজী হাবিব উল্যাহ মানিক, আলা উদ্দিন গঠন (বর্তমানে প্রয়াত), এয়াকুব নবী ও আনোয়ার হোসেন পাটোয়ারীকে যুগ্ম-আহ্বায়ক হিসেবে রাখা হয়। একই সময়ে ফেনী সদর উপজেলা ও ফেনী পৌরসভা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটিও গঠন করা হয়। পরবর্তীতে জেলা কমিটির নেতৃবৃন্দ পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি গঠন করেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ফেনীতে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমে গতি ফেরার কথা থাকলেও কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তহীনতার কারণে ৯০ দিনের সেই আহ্বায়ক কমিটি দিয়েই দীর্ঘ সাত বছর কাটাতে হচ্ছে জেলা বিএনপিকে। এর মধ্যে জেলা বিএনপির একজন যুগ্ম আহ্বায়কসহ বেশ কয়েকজন সদস্য মৃত্যুবরণ করেছেন। দলীয় হাইকমান্ডের নির্দেশনায় দুঃসময়ে যারা দলের হাল ধরেছিলেন, এমন ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করে কমিটি ঢেলে সাজানোর কয়েক দফা উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা ব্যর্থতায় পরিণত হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বিগত ১৭ বছর ধরে তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের দমন-পীড়নের কারণে সারা দেশের মতো ফেনীতেও বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হামলা-মামলার ভয়াবহতা ও প্রতিকূল পরিবেশের কারণে কোথাও কোনো সম্মেলন আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। তবে বিগত ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রমে নতুন করে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরতে শুরু করেছে। নানা কর্মসূচির মাধ্যমে তারা মাঠে নিজেদের শক্তির জানান দিচ্ছে। আওয়ামী লীগের আমলে নানা চাপে দলীয় কর্মকাণ্ড ঢিলেঢালা চললেও বর্তমানে বিভিন্ন কর্মসূচিতে রেকর্ডসংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতি চোখে পড়ে।
বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিয়ে জেল-জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হওয়া নেতারা মনে করছেন, এখন প্রবীণ ও নবীনদের সমন্বয়ে দুঃসময়ের পরীক্ষিত, ত্যাগী ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাদের প্রাধান্য দিয়ে দ্রুত নতুন কমিটি ঘোষণা করা উচিত। তাদের মতে, আওয়ামী লীগ আমলের নির্যাতিতদের মূল্যায়ন না করা হলে সাংগঠনিক কার্যক্রমে গতিশীলতা ফিরবে না। যদিও তৃণমূল পর্যায়ের বহু স্থানে আগের কমিটি না থাকায় সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠনে কিছুটা জটিলতা রয়েছে, তা সত্ত্বেও হাইকমান্ডের সরাসরি দিকনির্দেশনায় সম্মেলনের পথেই হাঁটতে জোর দিচ্ছেন অনেকে।
ফেনী জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক গাজী হাবিব উল্যাহ মানিক এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে গত বছরের ২ অক্টোবর ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস লেখেন। তিনি উল্লেখ করেন, ২০১৯ সালের এই দিনে ফেনী জেলা বিএনপির তিন মাসের মেয়াদের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষিত হয়। আজ অবধি একটা উপজেলা কমিটি ও পৌর কমিটির সম্মেলন হয়নি। মনে প্রশ্ন জাগে এ দল কীভাবে চলছে? তার এই পোস্টটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে দলীয় ফোরামে নানা আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় ওঠে।
দীর্ঘদিন পূর্ণাঙ্গ কমিটি না হওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ফেনী জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আলাল উদ্দিন আলাল বলেন, বিগত সময়ে আমাদের কোথাও গিয়ে স্বাভাবিকভাবে সম্মেলন করার পরিবেশ ছিল না। ফ্যাসিবাদী আওয়ামী শাসনের সময় বিএনপিকে রাজপথে দাঁড়াতেই দেওয়া হয়নি, যার কারণে সম্মেলন বা পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা সম্ভব হয়নি। এমনকি ফুলগাজীতে দলীয় কর্মসূচি পালনে গেলে ১৪৪ ধারা জারি করা হতো। এছাড়া ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে কমিটি গঠনের জন্য বৈঠক করতে গেলেও আমরা বারবার হামলার শিকার হয়েছি। তবে আগামী জাতীয় কাউন্সিলের আগেই এখানকার সব কমিটি পুনর্গঠনের কাজ শেষ করা হবে।
সোনাগাজী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক জয়নাল আবেদীন বাবলু বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপির কমিটি পূর্ণাঙ্গ না হওয়াটা অত্যন্ত হতাশাজনক। তাছাড়া উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও অনেকগুলো কমিটি এখনো বাকি রয়েছে। আমি আশা করব, দ্রুত সময়ের মধ্যে এসব কমিটি পুনর্গঠন করে রাজপথের নিবেদিত ও অবদান রাখা নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে দলটিতে নতুন নেতৃত্বের বিকাশ ঘটবে এবং সাংগঠনিক গতি বৃদ্ধি পাবে।
১৯৭৮ সালে পরশুরামের বাসিন্দা অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ হোসেনের হাত ধরে ফেনীতে বিএনপির দলীয় কার্যক্রমের সূচনা ঘটে। সে সময় তৎকালীন নেতা সাহাব উদ্দিন, আবু বক্কর চেয়ারম্যান, সাবেক সংসদ সদস্য রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া, আবদুল কাদেরসহ অনেক প্রবীণ নেতা এই যাত্রায় যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৮১-৮৩ সালে গঠিত কমিটিতে অ্যাডভোকেট আবুল হোসেন মজুমদারকে সভাপতি ও হাফেজ আহাম্মদকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১৯৮৬ সালের দিকে গঠিত ফেনী জেলা বিএনপির তৃতীয় কমিটিতে সভাপতি ছিলেন অ্যাডভোকেট আবুল হাশেম, সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন ফেরদৌস ও সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান।
পরবর্তীতে ১৯৯৬ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন মোশাররফ হোসেন এমপি এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন ভিপি। এরপর ২০০৭ সালে গঠিত আহ্বায়ক কমিটিতে সাঈদ ইস্কান্দারকে আহ্বায়ক ও ফেনী পৌরসভার সাবেক মেয়র নুরুল আফছারকে ১ম যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়। পরবর্তীতে ২০১১ সালের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে সাঈদ ইস্কান্দার সভাপতির এবং জিয়াউদ্দিন মিস্টার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। সেই কমিটির মাধ্যমে বেশ কয়েক বছর সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ার পর সর্বশেষ ২০১৯ সালে বর্তমান আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়, যেখানে শেখ ফরিদ বাহারকে আহ্বায়ক ও আলাল উদ্দিন আলালকে সদস্যসচিব করা হয়। কিন্তু এরপর দীর্ঘ সাত বছর পেরিয়ে গেলেও আর কোনো নতুন বা পূর্ণাঙ্গ কমিটি পায়নি ফেনী বিএনপি।



