লক্ষ্মীপুরে ৪ খুন: নেপথ্যে ডাকাতি, নাকি পুরোনো ক্ষোভ?

এশিয়া পোস্ট নিউজ, লক্ষ্মীপুর
লক্ষ্মীপুরে ৪ খুন: নেপথ্যে ডাকাতি, নাকি পুরোনো ক্ষোভ?
নিহত শাহিনুর বেগম, তার বড় মেয়ে সায়মা আক্তার, মেজো মেয়ে নাফিসা আক্তার ইকরা ও ছোট মেয়ে ফাতেমা আক্তার শিফা। ছবি : সংগৃহীত

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌর শহরের এক ব্যস্ততম এলাকায় তিন মেয়ে ও মাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয়দের গণপিটুনিতে অভিযুক্ত ঘাতক নিহত হয়েছে। তবে নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ কী এবং এর পেছনে অন্য কেউ জড়িত রয়েছে কি না, তা নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা কাটেনি।

Advertisement

বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে পৌরসভার ধানহাটা নদীর পাড় এলাকার একটি বহুতল ভবনে এ ঘটনা ঘটে।

নিহতরা হলেন শাহিনুর বেগম (৩৮), তার বড় মেয়ে সায়মা আক্তার (২১), মেজ মেয়ে নাফিসা আক্তার ইকরা (১৭) ও ছোট মেয়ে ফাতেমা আক্তার শিফা (১০)। অন্যদিকে স্থানীয়দের গণপিটুনিতে নিহত অভিযুক্ত যুবকের নাম অন্তর মজুমদার (২৮)।

প্রতিবেশী ও স্বজনদের দাবি, ঘরে থাকা নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার লুটের উদ্দেশ্যেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত রহস্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন নিহতদের স্বজন ও এলাকাবাসী।

এদিকে শুক্রবার (২৬ জুন) দুপুর পর্যন্ত এই লোমহর্ষক ঘটনায় থানায় কোনো মামলা দায়ের করা হয়নি। তবে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে রায়পুর থানা পুলিশ। এদিকে কুমিল্লার হোমনা উপজেলার নটিয়া ও বঙ্গারচর গ্রাম থেকে নিহতদের স্বজনরা বৃহস্পতিবার রাতেই রায়পুরে পৌঁছেছেন।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বৃহস্পতিবার সকালে ধানহাটা নদীর পাড় সড়কের আমির হোসেন মাস্টারের পাঁচতলা ভবনের নিচতলার একটি বাসায় ঢুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে শাহিনুর বেগম ও তার তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তাদের চিৎকার শুনে প্রতিবেশী আফরোজা বেগম রানী জানালা দিয়ে এক ব্যক্তিকে দেখতে পেয়ে বুদ্ধিমত্তা খাটিয়ে বাইরে থেকে ভবনের গেট বন্ধ করে দেন। এতে অভিযুক্ত অন্তর ভবনের ভেতরে আটকা পড়ে।

খবর পেয়ে স্থানীয়রা বাসায় ঢুকে চারজনের রক্তাক্ত মরদেহ দেখতে পান। পরে অন্তর ভবনের ছাদ হয়ে পাশের ভবনে পালানোর চেষ্টা করলে ক্ষুব্ধ জনতা তাকে আটক করে গণপিটুনি দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

ডাকাতির উদ্দেশ্যে হত্যাকাণ্ড?

স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রায় দেড় বছর আগে অন্তর একই ভবনের পঞ্চম তলায় ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকত। প্রায় আট মাস আগে সে বাসা ছেড়ে চলে যায়। সে জানত, ভবনের ভাড়ার টাকা শাহিনুর বেগমের কাছে জমা রাখা হতো এবং তার কাছে কিছু স্বর্ণালংকারও ছিল। এ কারণে ডাকাতির উদ্দেশ্যেই সে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন স্থানীয়রা।

পারিবারিক সূত্র জানায়, আজ রায়পুরে নিহতদের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে তাদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায়। সেখানে সন্ধ্যা ৬টার দিকে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন করা হবে।

অন্যদিকে, গণপিটুনিতে নিহত প্রধান সন্দেহভাজন অন্তর মজুমদারের মরদেহ এখনও লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। তার পরিবারের সদস্যদের খবর দেওয়া হলেও তারা এখন পর্যন্ত মরদেহ গ্রহণ করতে আসেনি।

এদিকে মর্মান্তিক এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারকেই নিঃস্ব করেনি, নাড়িয়ে দিয়েছে পুরো রায়পুরবাসীকে। স্থানীয় সবার একটাই প্রত্যাশা, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত রহস্য উদঘাটিত হোক এবং এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত থাকলে তারাও আইনের সর্বোচ্চ শাস্তির মুখোমুখি হোক।

‘নেপথ্যে অন্য কেউ আছে কি না তদন্ত হোক’

রায়পুর বাজার কমিটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদ বলেন, ‘এ ধরনের নির্মম হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। একজন মানুষের পক্ষে একই সঙ্গে চারজনকে কুপিয়ে হত্যা করা কঠিন বলে সাধারণ মানুষের ধারণা। তাই ঘটনার পেছনে অন্য কোনো চক্র জড়িত আছে কি না, সেটিও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। আমরা চাই প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হোক।’

যা বলছে পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ

রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মিয়া বলেন, ‘ঘটনাস্থল থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি ছেনি ও একটি পাটার শিল উদ্ধার করা হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এখনও মামলা না হলেও তার প্রস্তুতি চলছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হত্যার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।’

লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) অরূপ পাল বলেন, ‘নিহত চার নারীর ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। তাদের প্রত্যেকের মাথা, বুক, হাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের গভীর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। অভিযুক্ত অন্তরের সুরতহাল প্রতিবেদন পাওয়ার পর তার মরদেহেরও ময়নাতদন্ত করা হবে।’