উৎসবের আমেজ ঢেকে গেছে শোকের ছায়ায়

আব্দুর রাজ্জাকের ছোট ছেলে আহাদুর রহমান ছাব্বির বিয়ে করেছেন আবদুস সালাম মোড়লের মেয়ে মার্জিয়া আক্তার মিতুকে। বুধবার (১১ মার্চ) রাতে খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের নাকসা গ্রামের আবদুস সালাম মোড়লের বাড়িতে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) একটি মাইক্রোবাসে তারা বাগেরহাটের মোংলায় আব্দুর রাজ্জাকের বাড়ির পথে রওনা দেন। ১৪ জন বহনকারী মাইক্রোবাসটি রামপাল উপজেলার বেলাইব্রিজ এলাকায় এলে নৌবাহিনীর স্টাফ বাসের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। ঘটনাস্থলেই মাইক্রোবাসের চালকসহ ১৪ জন নিহত হন। আহত অবস্থায় একজনকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
শুক্রবার (১৩ মার্চ) মোংলার শেহলাবুনিয়া এলাকায় আব্দুর রাজ্জাকের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, যে বাড়িতে উৎসবের আমেজ চলছিল, সেই বাড়িসহ পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। মোংলা পৌর কবরস্থানে প্রস্তুত করা হয়েছে পাশাপাশি ৯টি কবর। একই পরিবারের নয়জনকে কবরগুলোতে দাফন করা হবে।
নিহতদের মধ্যে বর আহাদুর রহমান ছাব্বির, তার বাবা আব্দুর রাজ্জাক, ভাই আব্দুল্লাহ সানি, বোন উম্মে সুমাইয়া ঐশী, ঐশীর ছেলে সামিউল ইসলাম ফাহিম, বড় ভাই আশরাফুল আলম জনির স্ত্রী ফারহানা সিদ্দিকা পুতুল এবং তাদের সন্তান আলিফ, আরফা ও ইরাম—একই পরিবারের ৯ সদস্য।
স্ত্রী, এক ছেলে ও দুই মেয়েকে হারানো আশরাফুল আলম জনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমার সব শেষ হয়ে গেছে। স্ত্রী-সন্তান, ভাই-বোন—সবাইকে হারালাম। আমি এখন একা হয়ে গেলাম।
আব্দুর রাজ্জাকের ছোট ভাই মো. সাজ্জাদ সরদার বলেন, আমাদের বেড়ে ওঠা মোংলাতেই। গ্রামের বাড়ি কয়রায় হলেও এখানেই সংসার ছিল। ভাই তার মেয়ের বিয়েও কয়রায় দিয়েছেন, এখন ছেলের বিয়েও সেখানে হয়েছিল। কিন্তু এক দুর্ঘটনায় পুরো পরিবারটাই শেষ হয়ে গেল।
তিনি আরও বলেন, আশপাশের নয়টি মসজিদ থেকে খাটিয়া আনা হয়েছে। গোসল শেষে একে একে নয়জনের মরদেহ খাটিয়ায় রাখা হয়েছে। শুক্রবার জুমার নামাজের পর মোংলা উপজেলা পরিষদ চত্বরে জানাজা শেষে তাদের পৌর কবরস্থানে দাফন করা হবে।
মোংলা পৌর কবরস্থানের খাদেম মুজিবুর ফকির বরেন, পরিবারের সম্মতিতে একই স্থানে পাশাপাশি ৯টি কবর খোঁড়া হয়েছে। ১৭ বছর ধরে কবরস্থানের দায়িত্ব পালন করছি। কিন্তু কখনও একসঙ্গে একই পরিবারের এত সদস্যের জন্য কবর খুঁড়তে হয়নি। ঘটনাটি খুবই হৃদয়বিদারক।
প্রতিবেশী শিরিনা আক্তার বলেন, একসঙ্গে এতগুলো মরদেহ কখনও দেখিনি। এটা সহ্য করার মতো নয়।
অন্যদিকে কনে মার্জিয়া আক্তার (মিতু), তার ছোট বোন লামিয়া আক্তার, দাদি রাশিদা বেগম ও নানি আনোয়ারা বেগমের মরদেহ খুলনার কয়রা উপজেলায় নেওয়া হয়। শুক্রবার জুমার নামাজের আগে সেখানে তাদের জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
এছাড়া নিহত মাইক্রোবাসচালক নাঈমের বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার পেড়িখালী ইউনিয়নের সিংগেরবুনিয়া গ্রামে। শুক্রবার জুমার নামাজের আগে নিজ গ্রামে তার জানাজা সম্পন্ন হয়েছে।
নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বাগেরহাট জেলা প্রশাসন। বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) গোলাম মো. বাতেন ও পুলিশ সুপার (এসপি) হাসান চৌধুরী ঘটনাস্থল ও নিহতদের বাড়ি পরিদর্শন করেছেন।
জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, জেলা প্রশাসনের ত্রাণ তহবিল, জেলা পরিষদ এবং সড়ক পরিবহন আইনের ৫৪ ধারার আওতায় নিহতদের পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে নিহত মাইক্রোবাসচালক মো. নাঈম শেখের পরিবারকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।