logo
Advertisement

রাজশাহী/কোমর পানিতে বসতভিটা, পানিবন্দি ৫০ হাজার মানুষ

এশিয়া পোস্ট নিউজ
এশিয়া পোস্ট নিউজ
রাজশাহী, রাজশাহী
কোমর পানিতে বসতভিটা, পানিবন্দি ৫০ হাজার মানুষ
তলিয়ে গেছে বসতভিটা, অস্থায়ী পাটাতনে আশ্রয় নিয়েছেন দম্পতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে নিজের ডুবে যাওয়া বসতভিটার দিকে তাকিয়ে কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন ৫৭ বছর বয়সি রহিমা বেগম। পদ্মার পানি বাড়তে বাড়তে তার ঘরেও ঢুকে পড়েছে। রান্নাঘর, উঠান সবই এখন পানির নিচে। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে আশ্রয় নিতে হয়েছে অন্যের বাড়িতে।

রহিমা বেগমের মতো এমন অসহায় পরিস্থিতিতে পড়েছেন রাজশাহীর পদ্মা তীরবর্তী চরাঞ্চলের হাজারো মানুষ। গত দুই সপ্তাহ ধরে নদীর পানি বাড়তে থাকায় একের পর এক বসতঘর প্লাবিত হচ্ছে। কোথাও উঠান ডুবে গেছে, কোথাও ঘরের মেঝে ছুঁয়েছে পানি। অনেক পরিবার এরই মধ্যে ঘরবাড়ি ছেড়ে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, রাজশাহীর চর খানপুর, চর খিদিরপুর ও মাজারদিয়া এলাকার বিস্তীর্ণ অংশে পানি ঢুকে পড়েছে। এসব চরাঞ্চলে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন বলে দাবি স্থানীয়দের। পানির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তাদের দুর্ভোগ ও অনিশ্চয়তা।

বিশেষ করে চর খিদিরপুরের পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, মাত্র দুটি বাড়ি ছাড়া এলাকার প্রায় সব বসতবাড়িই পানিতে তলিয়ে গেছে। প্রতিদিন পানি বাড়তে থাকায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বাসিন্দাদের মধ্যে। কখন পানি আরও বাড়বে, আর কখন শেষ আশ্রয়টুকুও পানির নিচে চলে যাবে—এই শঙ্কায় কাটছে তাদের দিনরাত।

পানি ঢুকে পড়ায় ঘরবাড়ির আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন বাসিন্দারা। শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে উঁচু স্থানে যাওয়ার পাশাপাশি গবাদিপশুও সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে অনেকেরই নিরাপদ জায়গার অভাব রয়েছে।

চরাঞ্চলের বাসিন্দারা জানান, কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও কোমর পর্যন্ত পানি। ফলে স্বাভাবিক চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক এলাকায় নৌকা ছাড়া যাতায়াত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। স্কুলগামী শিশুদের চলাচলেও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

৪৫ বছর বয়সি সোলেমান আলী বলেন, ঘরের ভেতরে পানি ঢুকে পড়ায় বাধ্য হয়ে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। তিনি জানান, পানি প্রথমে উঠানে উঠেছিল। তখনও আশা ছিল পানি আর বাড়বে না। কিন্তু দিন যত গেছে, পানি ততই বেড়েছে। এখন ঘরের ভেতরেও পানি। রান্না করার জায়গা নেই, থাকারও উপায় নেই। শিশু ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন তারা।

চর খিদিরপুরের আরেক বাসিন্দা আব্দুল হান্নান বলেন, প্রথমে উঠানে পানি উঠেছিল। ভেবেছিলাম পানি আর বাড়বে না। কিন্তু দিন দিন পানি বেড়েই চলেছে। এখন ঘরের ভেতর পানি। রান্না করার জায়গা নেই। বাচ্চাদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি।

চর খানপুরের বাসিন্দা সেলিনা বেগম বলেন, ঘরে পানি ঢোকার পর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র উঁচু জায়গায় তুলে রাখা হয়েছে। কিন্তু পানি আরও বাড়লে সেগুলোও রক্ষা করা সম্ভব হবে না। একই সঙ্গে গরু-ছাগল নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা।

এদিকে, পানিবন্দী মানুষের দুর্ভোগের সঙ্গে যোগ হয়েছে বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট। বসতবাড়ির চারপাশ প্লাবিত হওয়ায় অনেকের পানির উৎসও পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে নিরাপদ পানি সংগ্রহ করতে দূরের উঁচু এলাকায় যেতে হচ্ছে।

মাজারদিয়া এলাকার স্বপন আলী বলেন, চারদিকে পানি থাকলেও সেই পানি পান করার উপায় নেই। দূর থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে শিশু ও বয়স্কদের।

অন্যদিকে, চরাঞ্চলের অনেক পরিবারের প্রধান সম্পদ গরু, ছাগলসহ বিভিন্ন গবাদিপশু। কিন্তু বিস্তীর্ণ চারণভূমি পানিতে ডুবে যাওয়ায় পশুর খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকেই শুকনো খাবার কিনে গবাদিপশু বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, পদ্মার পানি আরও বাড়লে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। যেসব পরিবার ইতোমধ্যে ঘরবাড়ি হারিয়েছে, তাদের জন্য দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়, বিশুদ্ধ খাবার পানি, শুকনো খাবার ও গবাদিপশুর খাদ্যের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম জানান, পানিবন্দি মানুষের মধ্যে বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকট দেখা দেওয়ায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, ত্রাণ বিতরণ ও মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা করা হচ্ছে।