logo

অব্যবহৃত শতবর্ষী তিন রেলস্টেশন, আগাছায় ঢাকা কৃষি-অর্থনীতির সম্ভাবনা

ইমরান হোসেন পিংকু
যশোর
অব্যবহৃত শতবর্ষী তিন রেলস্টেশন, আগাছায় ঢাকা কৃষি-অর্থনীতির সম্ভাবনা
মেহেরুল্লাহনগর রেলস্টেশন। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ট্রেন নেই, যাত্রী নেই— পড়ে আছে আগাছায় মোড়ানো জরাজীর্ণ ভবন। সময়ের পরিবর্তনে যশোরের গদখালী, ধোপাখোলা ও মেহেরুল্লাহনগর ঐতিহাসিক এই তিন রেলস্টেশনের এমনই দশা। এক সময় কৃষক, ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের পদচারণায় মুখর এসব স্টেশন এখন যেন পরিত্যক্ত। কোথাও স্টেশন ভবন ও প্ল্যাটফর্ম জঙ্গলে ঢেকে গেছে, কোথাও গরু-ছাগল চরে বেড়াচ্ছে। আবার সন্ধ্যার পর ভবনগুলোতে মাদকসেবীদের আনাগোনা দেখা যায় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এভাবে অব্যবহৃত পড়ে থাকায় হারিয়ে যেতে বসেছে রেল যোগাযোগের শতবর্ষী স্মৃতি। পাশাপাশি এসব স্টেশন সচল না থাকায় যাত্রী ও পণ্য পরিবহন থেকে সম্ভাব্য রাজস্ব আয়ের সুযোগও হারাচ্ছে রেলওয়ে।

স্থানীয়দের দাবি, তিন স্টেশন পুনরায় চালু করা হলে একদিকে যেমন ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো রক্ষা পাবে, অন্যদিকে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) শিক্ষার্থী, ফুলচাষি, কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ যাত্রীদের যাতায়াত সহজ হবে। বিশেষ করে গদখালীতে স্টেশন চালু হলে দেশের অন্যতম বৃহৎ ফুল উৎপাদন অঞ্চল থেকে ট্রেনে দ্রুত ফুল পরিবহনের সুযোগ তৈরি হবে। এদিকে শিক্ষার্থীদের দাবি, মেহেরুল্লাহনগর স্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি হলে যবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরের যশোর রেলস্টেশনে গিয়ে ট্রেন ধরার ভোগান্তি কমবে।

গদখালীর ফুল বাণিজ্যে খুলতে পারে নতুন দুয়ার

ঝিকরগাছার গদখালী ঐতিহাসিকভাবেই যশোরের গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। ১৮৮২ থেকে ১৮৮৪ সালের মধ্যে বেঙ্গল সেন্ট্রাল রেলওয়ে দমদম জংশন থেকে খুলনা পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ করে। এ রেলপথের অংশ হিসেবে বেনাপোল-যশোর রুটে গদখালী স্টেশন গড়ে ওঠে। একসময় শিয়ালদহ থেকে বনগাঁ, পেট্রাপোল, গদখালী হয়ে খুলনা যাওয়া ‘বরিশাল এক্সপ্রেস’ চলাচল করত এ পথে। দেশভাগের পরও পাসপোর্ট-ভিসার মাধ্যমে দুই বাংলার মানুষের যোগাযোগ ছিল। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর বন্ধ হয়ে যায় এ রুটের আন্তঃদেশীয় ট্রেন চলাচল।

বর্তমানে গদখালী দেশের অন্যতম প্রধান ফুল উৎপাদন অঞ্চল। কিন্তু ফুলের বাণিজ্যিক গুরুত্ব বাড়লেও রেলস্টেশনটি পড়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়। স্টেশন ভবনের দেয়ালে এখনো লেখা ‘টিকিট লইবেন’ লেখা, টিকিট কাউন্টারের মলিন বোর্ডে দেওয়া সময়সূচি এবং শেওলা জমে যাওয়া ‘গদখালী’ নামটি রেল যোগাযোগের অতীতের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাত্র।

গদখালী ফুল উৎপাদক ও বিপণন সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুর রহিম বলেন, “গদখালীতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ফুল উৎপাদন হয়। স্টেশনটি চালু হলে ট্রেনে করে ফুল পদ্মা সেতু হয়ে দ্রুত ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো যাবে। এতে পরিবহন খরচ ও সময় কমবে, ফুল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও কমবে। ফুলের রাজ্যে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসে। স্টেশন চালু হলে তারাও সহজে যাতায়াত করতে পারবেন।”

rail2

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে স্টেশন, তবুও ট্রেন ধরতে যেতে হয় ১৩ কিলোমিটার

যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা গ্রামে মেহেরুল্লাহনগর রেলস্টেশন। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর বর্তমানে এখানে একটি মেইল ট্রেন থামে। কিন্তু কোনো আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি নেই। অথচ স্টেশনটির কাছেই যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৮টি বিভাগ ও আটটি অনুষদের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাতায়াত করতে হয়। এ কারণে মেহেরুল্লাহনগর স্টেশনে আন্তঃনগরসহ সব ধরনের ট্রেনের যাত্রাবিরতির দাবি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

যবিপ্রবির জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের শিক্ষার্থী সাকিবুল হাসান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের এত কাছে মেহেরুল্লাহনগর স্টেশন থাকার পরও আন্তঃনগর ট্রেনগুলো এখানে থামে না। ট্রেন ধরতে আমাদের প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরের যশোর স্টেশনে যেতে হয়। বিশেষ করে রাতে ট্রেন ধরতে গেলে বাড়তি সময় ও অর্থ ব্যয় হয়। গভীর রাতে যশোরে নেমে ক্যাম্পাসে ফিরতেও সমস্যা হয়। স্টেশনটি সংস্কার করে আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি দিলে শিক্ষার্থীদের বড় উপকার হবে।

আরেক শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদ বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য ট্রেন অন্যতম সাশ্রয়ী যোগাযোগব্যবস্থা। কিন্তু কাছের স্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেন না থামায় আমাদের শহরে যেতে হয়। এতে সময় ও অর্থ দুটোই বেশি লাগে। মেহেরুল্লাহনগরে ট্রেন থামলে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নয়, আশপাশের এলাকার সাধারণ মানুষও উপকৃত হবেন।

গত ১২ আগস্ট যবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীরের নির্দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কাজী জালাল উদ্দীন স্বাক্ষরিত চিঠিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে মেহেরুল্লাহনগর স্টেশনে আন্তঃনগরসহ সব ধরনের ট্রেনের যাত্রাবিরতির দাবি জানানো হয়।

rail6

সন্ধ্যা নামলেই বসে মাদকের আড্ডা

যশোর-বেনাপোল রেলপথের ধোপাখোলা স্টেশনটি ১৮৮৪ সালে স্থাপিত। এ স্টেশনে একসময় আশপাশের কৃষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের গুরুত্বপূর্ণ যাতায়াতকেন্দ্র ছিল। কৃষিপণ্য পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও স্টেশনটির ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

সড়ক যোগাযোগ সহজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে কমছে স্টেশনটির গুরুত্ব। একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায় কার্যক্রম। এখন স্টেশন ভবন ও প্ল্যাটফর্ম আগাছা-লতাপাতায় ঢেকে আছে। ভবনের বিভিন্ন অংশ জরাজীর্ণ। দিনের বেলায় সেখানে গরু-ছাগল চরতে দেখা যায়। সন্ধ্যে নামলে বাড়ে মাদকসেবীদের আনাগোনা।

স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ধোপাখোলা স্টেশন এখন দেখলে বোঝার উপায় নেই এখানে এক সময় মানুষের কত ভিড় ছিল। ভবনটি দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত পড়ে আছে। সন্ধ্যার পর এখানে লোকজনের আনাগোনা কমে গেলে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে। এভাবে পড়ে থাকার কারণে জায়গাটি অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্টেশনটি সংস্কার করে আবার চালু করা হলে এলাকার মানুষের উপকার হবে।

বৃহত্তর যশোর রেল যোগাযোগ উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির সদস্য সচিব প্রকৌশলী রুহুল আমিন বলেন, সাধারণ মানুষের যাতায়াতে রেল সবচেয়ে কম খরচের ও নিরাপদ মাধ্যম। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা স্টেশনগুলো পুনরায় চালু করা গেলে কৃষিপণ্য সহজে পরিবহনের পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য আরও গতিশীল হবে। এতে এলাকার মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাড়বে।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীর বলেন, মেহেরুল্লাহনগর স্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি চালু হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর যাতায়াত সহজ হবে। এতে তাদের সময় ও পরিবহন ব্যয় কমার পাশাপাশি শিক্ষা ও গবেষণার কাজে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাতায়াতের সুযোগও বাড়বে।

যশোর রেলওয়ে জংশনের স্টেশনমাস্টার সাইদুজ্জামান বলেন, কোনো স্টেশন পুনরায় চালু করা কিংবা নতুন কোনো স্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার। তবে স্থানীয় মানুষের দাবির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বন্ধ স্টেশনগুলোর বর্তমান অবস্থা ও জরাজীর্ণ অবকাঠামোর বিষয়টিও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছে।