
মাঝখানে দূরত্ব মাত্র ১০ ফুট। এক পাশে সুফি সাধক শাহ ফতেহ আলী (রহ.)-এর মাজার ও মসজিদ, অন্য পাশে মা আনন্দময়ী কালীমাতা মন্দির। একদিকে নামাজ, জিকির ও ধর্মীয় আচার; অন্যদিকে পূজা-অর্চনা। উপাসনা পদ্ধতি আলাদা হলেও দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি চলছে দুই ধর্মের মানুষের প্রার্থনা। বগুড়া শহরের ফতেহ আলী বাজার এলাকার এই দুই উপাসনালয় যেন ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের এক পরিচিত উদাহরণ।
বিশেষ করে কালীপূজার সময় এ এলাকার চিত্র হয়ে ওঠে আরও বর্ণিল। কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে দীপাবলি উপলক্ষে মন্দির ও আশপাশের এলাকায় জ্বালানো হয় অসংখ্য প্রদীপ। সন্ধ্যা থেকে বাড়তে থাকে ভক্তদের আনাগোনা। মধ্যরাতে শাস্ত্রীয় বিধান মেনে অনুষ্ঠিত হয় দেবী কালীর পূজা। আয়োজন থাকে অঞ্জলি, হোম-যজ্ঞ ও মহাপ্রসাদ বিতরণের। ঢাকের বাদ্য আর ভক্তদের প্রার্থনায় মুখর হয়ে ওঠে মন্দির প্রাঙ্গণ।
এ সময় মাজারের পাশ দিয়ে মন্দিরে আসেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। মাজারে আসা মুসল্লি ও ভক্তদের সঙ্গে তাদের স্বাভাবিক সৌজন্য বিনিময় হয়। ধর্মীয় পরিচয় আলাদা হলেও দীর্ঘদিনের এই সহাবস্থানে নেই কোনো অস্বস্তি। বরং একে অন্যের ধর্মীয় আয়োজনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই চলেন দুই সম্প্রদায়ের মানুষ।
স্থানীয় ইতিহাস ও প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, সুফি সাধক শাহ ফতেহ আলী (রহ.) ১৬৮৩ সালে ভারতের আশকারায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মোহাম্মদ হোসেনও ছিলেন একজন সাধক। ছোটবেলায় আধ্যাত্মিক শিক্ষা অর্জনের জন্য তাকে ছামন্দর নামের একটি স্থানে পাঠানো হয়। সেখানে সাধক মজনু শাহর সান্নিধ্যে টানা নয় বছর সাধনা করেন তিনি।
মজনু শাহর মৃত্যুর পর ফতেহ আলী (রহ.) ১৮ বছর চীনে এবং ২১ বছর ভারতের আজমীর শরিফে ধর্মচর্চা করেন। পরে ১৭৫৮ সালে করতোয়া নদীপথে বগুড়ায় আসেন তিনি। নদীর ঘাটে আস্তানা গড়ে শুরু করেন ধর্ম প্রচার। ১৭৭৭ সালে মৃত্যুর পর ওই আস্তানাতেই তাকে সমাহিত করা হয়। এরপর থেকে তার ভক্ত-আশেকানরা মাজারের খেদমত করে আসছেন। প্রতিবছর ২২ বৈশাখ তার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে মাজারে ওরশ অনুষ্ঠিত হয়।
অন্যদিকে, মন্দিরের সাইনবোর্ডে থাকা তথ্য অনুযায়ী, শ্রীশ্রী আনন্দময়ী মা কালীমন্দিরটি আনুমানিক ১১৫৫ বঙ্গাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সেখানে নিয়মিত পূজা-অর্চনা হয়ে আসছে। প্রতিবছর কালীপূজায় মন্দিরে বিশেষ আয়োজন করা হয়। স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে মন্দিরটি দীর্ঘদিনের পরিচিত উপাসনালয়।
মন্দিরে আসা এক ভক্ত বলেন, ছোটবেলা থেকেই এই মন্দির দেখে আসছি। মাজারটিও আমাদের খুব পরিচিত। কখনো মনে হয়নি, পাশাপাশি দুটি ধর্মের উপাসনালয় থাকায় কোনো সমস্যা হতে পারে। আমরা যে যার ধর্ম পালন করি, একে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা রাখি।
আরেক ভক্ত বলেন, এখানে পূজা দিতে এলে মাজারের পাশ দিয়েই আসতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি আছে। এলাকার মানুষও বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবেই দেখেন। এটাই আমাদের কাছে ভালো লাগার বিষয়।
মন্দিরের পুরোহিত রাজেন্দ্রলাল সান্যাল বলেন, আমি ৫২ বছর ধরে এখানে পূজা করছি। এত বছর ধরে দুই ধর্মের মানুষকে পাশাপাশি দেখছি। এখানে সবাই মিলেমিশে থাকেন। একে অন্যের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের প্রতি শ্রদ্ধা দেখান। এই পরিবেশ দেখে আমারও ভালো লাগে।
মাজারের খাদেম ফিরোজ আহমেদ বলেন, এটি হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতির বন্ধন। পাশাপাশি দুটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের মতো করে চলছে। কারও ধর্মীয় কাজে কেউ বাধা দেন না। আমরা সবাই মিলেমিশে থাকতে চাই।
বগুড়া মহানগর পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি পরিমল প্রসাদ রাজ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই দুই ধর্মের মানুষের সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রয়েছে। পূজা ও ওরশের সময় দুই সম্প্রদায়ের পারস্পরিক সহযোগিতা নজির স্থাপন করেছে।

