নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের পুনর্গঠনের চেষ্টা, এনসিপি শিবির ছাত্রদলের হুঁশিয়ারি

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নিষিদ্ধ ঘোষিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রকাশ্য রাজনৈতিক কার্যক্রম অনেকটাই স্তিমিত হলেও খুলনায় সংগঠনটির সাংগঠনিক তৎপরতা পুরোপুরি থেমে নেই। বিভিন্ন সময়ে ঝটিকা মিছিলের পাশাপাশি মহানগর ও জেলা কমিটি পুনর্গঠনের উদ্যোগের তথ্য মিলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি বিজ্ঞপ্তিকে ঘিরে নতুন কমিটিতে পদ পেতে নেতাকর্মীদের তৎপরতাও বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে নিষিদ্ধ সংগঠনটির পুনর্গঠনের চেষ্টা প্রতিহতের ঘোষণা দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ছাত্রশিবির ও ছাত্রদল।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে খুলনার শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতা দেশ ছেড়েছেন, কেউ আত্মগোপনে রয়েছেন, আবার কেউ গ্রেপ্তার হয়েছেন। একই সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এরপর সংগঠনটির প্রকাশ্য কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। তবে সম্প্রতি সংগঠনটির পুনর্গঠনের উদ্যোগের ইঙ্গিত মিলেছে। কেন্দ্রের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান স্বাক্ষরিত বলে প্রচারিত একটি বিজ্ঞপ্তিতে খুলনা মহানগর ও জেলা কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে নতুন কমিটি গঠনের জন্য জীবনবৃত্তান্ত (সিভি) আহ্বান করা হয়েছে। সেখানে আবেদনকারীদের ছবি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রত্যয়নপত্র, জাতীয় পরিচয়পত্র, এসএসসি ও এইচএসসিসহ বিভিন্ন পরীক্ষার সনদ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নির্দিষ্ট ই-মেইলে পাঠানোর নির্দেশনা রয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিটি ইতোমধ্যে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। খুলনার কয়েকজন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা প্রকাশ্যেই ওই ই-মেইলে আবেদন পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন। কেউ কেউ নিজেদের প্রার্থিতার প্রচারণাও শুরু করেছেন।
খুলনা জেলা ছাত্রলীগের সদ্য বিদায়ী সভাপতি পারভেজ হাওলাদার নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে বিজ্ঞপ্তিটি শেয়ার করে লিখেছেন, ‘শেষ দিন পর্যন্ত সংগঠনের হয়ে কাজ করতে পেরেছি—এই তৃপ্তি নিয়েই আজীবন একজন কর্মী হয়ে থাকব।’ তার পোস্টে শতাধিক নেতাকর্মী মন্তব্য করে নতুন কমিটির জন্য শুভকামনা জানান।
জেলা ছাত্রলীগের সদ্য বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক ইমরান হোসেনও নতুন কমিটিকে স্বাগত জানিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। অন্যদিকে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশীদের পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চলছে। সমর্থকেরা ছবি, পোস্টার ও বিভিন্ন পোস্টের মাধ্যমে তাদের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন।
খুলনা মহানগর ছাত্রলীগের সোনাডাঙ্গা থানার সাধারণ সম্পাদক রুম্মান আহমেদ বলেন, আমরা নিজেদের মধ্যে সাংগঠনিক যোগাযোগ জোরদার করছি। সংগঠনকে পুনর্গঠিত ও আরও সুসংগঠিত করার লক্ষ্যেই আমাদের কার্যক্রম চলছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা আমাদের প্রতিপক্ষ নয়; তাদের প্রতি আমাদের কোনো ক্ষোভ বা অভিযোগও নেই। আমরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় রেখে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে চাই।
এ বিষয়ে এনসিপি খুলনা মহানগরের সংগঠক আহম্মদ হামীম রাহাত বলেন, গণঅভ্যুত্থানে সাধারণ ছাত্র-জনতার ওপর সশস্ত্র হামলার অভিযোগে নিষিদ্ধ হওয়া ছাত্রলীগকে জনগণ আগেই প্রত্যাখ্যান করেছে। নিষিদ্ধ হওয়ার পরও তাদের গোপন সাংগঠনিক তৎপরতা চলতে দেওয়া জুলাইয়ের শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগের প্রতি অবমাননা। খুলনার মাটিতে কোনো ফ্যাসিবাদী অপতৎপরতা বা পুনর্বাসনের চেষ্টা সফল হতে দেওয়া হবে না।
ঝটিকা মিছিল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ ধরনের ঝটিকা মিছিল মূলত নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা এবং জনমনে আতঙ্ক তৈরির অপচেষ্টা। প্রকাশ্যে রাজপথে কর্মসূচি দেওয়ার সাহস না থাকায় তারা কয়েক সেকেন্ডের জন্য ব্যানার প্রদর্শন করে ছবি বা ভিডিও ধারণ করে দ্রুত সরে যায়। খুলনার ছাত্র-জনতা এ ধরনের তৎপরতা সম্পর্কে সতর্ক রয়েছে এবং যেকোনো অপচেষ্টা প্রতিহত করতে প্রস্তুত।
পুলিশের ভূমিকা সম্পর্কে হামীম রাহাত বলেন, নিষিদ্ধ সংগঠনের তৎপরতা ঠেকাতে পুলিশের বর্তমান ভূমিকা আমাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগে আরও দৃশ্যমান, পেশাদার ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করা জরুরি।
ছাত্র লীগের নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়ে তিনি বলেন, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নতুন কমিটি গঠনের যেকোনো উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করা উচিত। এ ধরনের উদ্যোগ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনার পরিপন্থী এবং ক্যাম্পাসে অস্থিরতা সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি করতে পারে। ছাত্র-জনতাকে সঙ্গে নিয়ে এ ধরনের যেকোনো পুনর্বাসনের প্রচেষ্টা গণতান্ত্রিক উপায়ে প্রতিরোধ করা হবে।
খুলনা মহানগর ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক জি এম রাজিবুল আলম বাপ্পি বলেন, পুলিশ প্রশাসনের ভেতরে এখনো আওয়ামী লীগের প্রভাব রয়েছে বলেই নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রশাসনের ভেতরে যদি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত কেউ থেকে থাকেন, তাহলে তাদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। গোপনে কয়েক মিনিটের ঝটিকা মিছিল করে জনসমর্থন অর্জন করা সম্ভব নয়। ছাত্র-জনতা যেকোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা বা নিষিদ্ধ সংগঠনের তৎপরতা মোকাবিলায় সবসময় প্রস্তুত রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিদেশে অবস্থান করে সংগঠনের শীর্ষ নেতারা নতুন কমিটি দেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছেন। এতে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরাই বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বেন। নিষিদ্ধ সংগঠনের তৎপরতা রোধে পুলিশের বর্তমান ভূমিকা নিয়ে আমি সন্তুষ্ট নই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও নিরপেক্ষ, পেশাদার ও কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে, যাতে আইন সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ হয়।
খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট শফিকুল আলম মনা বলেন, নিষিদ্ধ সংগঠনের সাংগঠনিক তৎপরতা উদ্বেগজনক। শুধু রাজপথেই নয়, ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মেও তারা সক্রিয় রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও কঠোর ভূমিকা নেওয়া উচিত।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির খুলনা মহানগর সভাপতি রাকিব হাসান বলেন, নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সাম্প্রতিক তৎপরতা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও কার্যকর ও দৃশ্যমান ভূমিকা প্রত্যাশা করি। প্রশাসনের ভেতরে কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব থেকে থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। গোপনে ঝটিকা মিছিল বা কর্মসূচি দিয়ে জনসমর্থন অর্জন করা সম্ভব নয়। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষ সতর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে দেশের বাইরে অবস্থান করে সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের বিভিন্ন সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরাই বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরপেক্ষ ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
এ বিষয়ে খুলনা জেলা পুলিশ সুপার তাজুল ইসলাম বলেন, জেলায় ছাত্রলীগের তৎপরতা খুবই সীমিত। তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।
কেএমপির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) এম এম শাকিলুজ্জামান বলেন, নিষিদ্ধ ছাত্রসংগঠনের যেকোনো তৎপরতার বিরুদ্ধে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।
.png)

