logo

আলিফ হত্যায় সরাসরি অংশ নেন পাঁচজন, গুলি করেন তাজুল

আলিফ হত্যায় সরাসরি অংশ নেন পাঁচজন, গুলি করেন তাজুল
সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। ছবি: এশিয়া পোস্ট

নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির হত্যা মামলায় দুই আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে তারা বলেছেন, তাজুল ইসলাম এ হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী। হত্যাকাণ্ডে সরাসরি পাঁচজন অংশ নেন। তাদের মধ্যে তাজুল পিস্তল দিয়ে আলিফকে গুলি করেন। জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ এসব তথ্য জানিয়েছে।

রোববার (১ নভেম্বর) বিকেলে দুর্গাপুর চৌকি আদালতের বিচারক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল আমিন ভুঁইয়ার কাছে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন ইমরান ইসলাম ওরফে ইমন (২৪) ও মো. সাব্বির আহম্মেদ (২৫)। বিকেল পৌনে চারটায় শুরু হয়ে তাদের জবানবন্দি চলে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত। পরে বিচারক তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ বলেন, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে দুই আসামি জানিয়েছেন, তাজুল ইসলামের সঙ্গে সাংবাদিক আলিফের আগে থেকেই বিরোধ ছিল। সেই বিরোধের জেরেই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। তারা তাজুলের সহযোগী হিসেবে বিভিন্ন কাজ করতেন। সীমান্ত এলাকায় তাদের বিভিন্ন ব্যবসা ছিল। এসব ব্যবসায় আলিফ বাধা দিতেন এবং পুলিশকে তথ্য দিতেন। এ ছাড়া ব্যবসা করতে হলে তাকে মাসে টাকা দিতে হবে বলেও আলিফ জানিয়েছিলেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন তারা। এসব কারণে আলিফের প্রতি তাদেরও ক্ষোভ ছিল।

ওসি আরও বলেন, দুই আসামির ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডে সরাসরি পাঁচজন অংশ নেন। তাজুল ইসলাম পিস্তল দিয়ে আলিফকে গুলি করেন। তার মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর লোকজন চলে এলে তারা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান।

জবানবন্দিতে তাজুল ছাড়া আরও কয়েকজনের নাম এসেছে জানিয়ে ওসি বলেন, তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না। হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবাইকে গ্রেপ্তার করার লক্ষ্যেই তাদের পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে।

নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, দুই আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। সেখানে হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে তাজুল ইসলামের নাম এসেছে। সহযোগী হিসেবে নিজেদের নাম ছাড়াও আরও কয়েকজনের নাম বলেছেন তারা।

পুলিশ সুপার বলেন, মামলার তদন্ত অনেক দূর এগিয়েছে। হত্যাকাণ্ডে আর কারা জড়িত, সে বিষয়ে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। আশা করছি, দ্রুত তাদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে পারব। এরপর সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত জানানো হবে।

এর আগে শনিবার ভোরে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ধনপুর বাজার এলাকা থেকে ইমরান ও সাব্বিরকে গ্রেপ্তার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল। এ নিয়ে সাংবাদিক আলিফ হত্যা মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হলো। এর আগে ১৮ অক্টোবর সাজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্ব এবং ২০ অক্টোবর আশিকুর রহমান ওরফে প্রাঙ্গণকে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালত তাদের পুলিশ রিমান্ডে পাঠিয়েছিলেন।

এদিকে আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা রাজধানীর ধানমন্ডির একটি বেসরকারি হাসপাতালে নার্স হিসেবে চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। নেত্রকোনা-১ (কলমাকান্দা-দুর্গাপুর) আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল তার চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার তিনি কাজে যোগ দেন। দুই সন্তান ও মাকে নিয়ে ঢাকায় চলে এসেছেন আনন্দিতা। আপাতত সেখানেই থাকবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

স্বামীর হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে আনন্দিতা বলেন, গত বছরের ১০ নভেম্বর সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাটে আমার স্বামীর ওপর যখন হামলা হয়েছিল, তখন তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন, নদীর তীরে দূরে তাজুল ইসলাম পিস্তল হাতে দাঁড়িয়ে ছিল। ওই হামলায় ইমন, সাব্বির ও সৌরভ ছিল বলেও আমার স্বামী জানিয়েছিলেন।

তিনি আরও বলেন, আমি চাই, তাজুল ইসলাম ও শুটার শামীমসহ এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রত্যেক আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তার করা হোক। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আমি আমার স্বামীকে আর কখনও ফিরে পাব না। কিন্তু যারা তাকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করেছে, আমার দুই সন্তানকে এতিম করেছে, আমাকে স্বামীহারা করেছে, তাদের শাস্তি দেখে যেতে চাই। আমি তাদের ফাঁসি চাই।

গত ১৫ অক্টোবর রাতে দুর্গাপুর উপজেলার শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের উত্রাইল বাজারসংলগ্ন তেলনজিয়া এলাকায় গুলিতে নিহত হন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। তিনি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি ছিলেন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। ওই পেজে সীমান্ত এলাকায় চোরাচালানসহ বিভিন্ন অপরাধ ও অনিয়ম নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করতেন তিনি।

হত্যাকাণ্ডের পরদিন আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা বাদী হয়ে দুর্গাপুর থানায় অজ্ঞাতপরিচয় সাত থেকে আটজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন।

আকরাম হোসেন

সম্পাদনা

আকরাম হোসেন

সহকারী বার্তা সম্পাদক | এশিয়া পোস্ট