৩২ সবজির পাজনে বিজুর স্বাদ, উৎসবে মাতোয়ারা পাহাড়

চাকমা জনগোষ্ঠীর বর্ষবরণের অন্যতম বড় উৎসব ‘বিজু’ এখন পাহাড়ে উৎসবের আমেজ ছড়াচ্ছে। ফুল বিজু, মূল বিজু ও গজ্যাপজ্যা—এই তিন পর্বে উদযাপিত হয় উৎসবটি। চৈত্রের শেষ দিন মূল বিজুকে ঘিরেই থাকে সবচেয়ে বেশি আয়োজন, যার প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘পাজন’।
আবহমানকাল ধরে পাহাড়ি সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে টিকে আছে এই পাজন। বছরের শেষদিন ভোরের আলো ফুটতেই পাড়ায় পাড়ায় শুরু হয় পাজন রান্নার প্রস্তুতি। পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে সবজি কাটাকাটি করেন, পরে তা ধুয়ে বড় হাঁড়িতে রান্না করা হয়। রান্না শেষে ঘরে ঘরে চলে পাজনের আপ্যায়ন।
ঐতিহ্য অনুযায়ী, কমপক্ষে ৩২ ধরনের সবজি দিয়ে তৈরি করা হয় পাজন। কোথাও কোথাও এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় একশোতে। এতে থাকে কাঁঠাল, কলা, মূলা, মিষ্টি কুমড়া, বেতডগা, তারা প্রভৃতি সবজির সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের শুঁটকি।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, বছরের শেষ বা প্রথম দিনে এই পাজন খেলে শরীর সুস্থ থাকে এবং রোগবালাই থেকে মুক্তি মেলে। তাই এই দিনে পাজন খাওয়াকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। শুধু নিজেদের মধ্যেই নয়, অতিথিদের আপ্যায়নেও পাজনের জুড়ি নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা আবর্তন চাকমা বলেন, ১২ এপ্রিল ফুল ভাসিয়ে বর্ষবিদায় জানানো হয়। পরদিন সকালে গোসল শেষে বড়দের প্রণাম করে শুরু হয় মূল বিজুর আয়োজন। এরপর বাড়িতে নানা ধরনের রান্না হয়, যার মধ্যে পাজন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যত বেশি সবজি দেওয়া যায়, ততই ভালো হয়।
সুপ্তা চাকমা বলেন, ভোরে ঘুম থেকে উঠে পাজনের জন্য সবজি প্রস্তুত করা হয়। সবজি কেটে পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে রান্না করা হয়। এটি আমাদের জন্য বিশেষ একটি খাবার।
তন্নী চাকমা বলেন, পাজনের পাশাপাশি নানা ধরনের পিঠাও তৈরি করা হয়। অতিথিদের আপ্যায়ন করা হয়, আবার আমরাও অন্যের বাড়িতে যাই। বিনিতা চাকমা বলেন, আমাদের বিশ্বাস, সাত বাড়ি ঘুরে পাজন খেলে শরীর ভালো থাকে। তাই এই দিনে সবাই একে অপরের বাড়িতে যায়।
বাড়ি বাড়ি বেড়াতে থাকা শিক্ষক রিংকু দে বলেন, এই দিনে আমরা পাহাড়ি বন্ধু ও সহকর্মীদের বাড়িতে বেড়াতে যাই। যেখানে যাই, পাজন খাওয়া যেন বাধ্যতামূলক। আরেক শিক্ষক আয়েশা আক্তার বলেন, উৎসবটি এখন সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। পাহাড়ি-বাঙালি সবাই মিলে আনন্দ ভাগাভাগি করি।
বিজুর তৃতীয় দিন ১৪ এপ্রিল চাকমা ও ত্রিপুরা সম্প্রদায় পালন করবে গজ্যাপজ্যা। একই দিনে মারমা সম্প্রদায় উদযাপন করবে ঐতিহ্যবাহী পানি খেলার উৎসব। আর আগামী ১৭ এপ্রিল রাঙামাটি স্টেডিয়ামে মারমাদের সাংগ্রাই পানি খেলার মধ্য দিয়ে শেষ হবে পাহাড়ের বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ উৎসব।