Advertisement

‘আমাকে মাফ করে দিও’ শেষ আকুতিতেই ঝরে গেল ১৩ বছরের মেহেদী

এশিয়া পোস্ট নিউজ, যশোর
‘আমাকে মাফ করে দিও’ শেষ আকুতিতেই ঝরে গেল ১৩ বছরের মেহেদী
জুলাই আন্দোলনে শহীদ কিশোর মেহেদী হাসান। ছবি: সংগৃহীত

‘মামাকে বলে একটা হেলিকপ্টার পাঠাতে পারো কি না দেখো। না হলে জাবির হোটেলেই মারা যাব। আগুন লেগেছে পুরো হোটেলে... আমরা ছয়তলায় আছি। আর দেখা হবে না। আমাকে মাফ করে দিয়ো।’ মৃত্যুর ঠিক আধা ঘণ্টা আগে মা ও বড় ভাবির কাছে মোবাইল ফোনে কল করে আকুল কণ্ঠে কথাগুলো বলেছিল ১৩ বছরের কিশোর মেহেদী হাসান।

Advertisement

চব্বিশের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের সেই ঐতিহাসিক দিনে বিজয়ের উল্লাস মুহূর্তেই বিষাদে রূপ নেয় যশোরের ‘হোটেল জাবির ইন্টারন্যাশনাল’-এ। অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহ ধোঁয়া ও আগুনের লেলিহান শিখায় সেদিন যেসব প্রাণ অকালে ঝরে যায়, তাদেরই একজন পুলেরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র মেহেদী হাসান। অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তিতে আজও মেহেদীর স্বজনদের বুকফাটা কান্না থামেনি।

যশোর সদর উপজেলার কৃষ্ণবাটি আমিননগর গ্রামের রুস্তম আলীর ছোট ছেলে মেহেদী ছিল পরিবারের চোখের মণি। স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত মা মনোয়ারা বেগম ভারতের চিকিৎসকের পরামর্শে মেহেদীকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন; মেহেদীর জন্মের পর সত্যিই অলৌকিকভাবে ক্যানসারমুক্ত হন তিনি। সেই মা আজ অঝোরে কেঁদে বলেন, ‘যে সন্তানের কারণে আমি জীবন ফিরে পেলাম, সেই সন্তানই আমাকে ছেড়ে চলে গেল!’

আন্দোলনের অদম্য মুখ ও শেষ বিদায়

জুলাই আন্দোলন চলাকালে প্রতিদিন স্কুল শেষে চাঁচড়া চেকপোস্টে মিছিল-সমাবেশে ছুটে যেত মেহেদী। মা-বাবা বিপদের আশঙ্কায় বারণ করলে সে দৃপ্ত কণ্ঠে বলত, ‘আবু সাঈদ মারা গেছে। ভয়ে বসে থাকলে স্বৈরাচার হটাতে পারব না। প্রয়োজনে শহীদ হব।’

ঘটনার দিন দুপুরে বাবার কাছ থেকে ৩০ টাকা চেয়ে নিয়ে ‘বিজয় মিছিলে যাচ্ছি’ বলে সাইকেল চেপে বের হয় মেহেদী। মিছিলটি জাবির হোটেলের সামনে পৌঁছালে হঠাৎ বিকট শব্দে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আত্মরক্ষার্থে অন্যদের সঙ্গে সে-ও হোটেলের ভেতর আশ্রয় নেয়। কিন্তু সেই আশ্রয়ই কাল হয়ে দাঁড়ায়। মুহূর্তের মধ্যে পুরো ভবনে আগুন ধরে যায় এবং বিষাক্ত ধোঁয়ায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে তারা।

ফায়ার সার্ভিস ও স্বজনেরা পৌঁছানোর আগেই সব শেষ হয়ে যায়। রাতে যশোর জেনারেল হাসপাতালের মর্গে অর্ধপোড়া অবস্থায় মেহেদীর মরদেহ খুঁজে পান তার বাবা। মেহেদীর পকেটে অক্ষত অবস্থায় পড়ে ছিল বাবার দেওয়া সেই ৩০ টাকার অব্যবহৃত ২০ টাকা।

পরিবারের আকুতি: দ্রুতই পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি

মেহেদী হাসানের অকালপ্রয়াণে ‘জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন’, জেলা প্রশাসন ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে আর্থিক সহায়তা ও স্মারক দেওয়া হলেও, পরিবারটি আজও অপেক্ষা করে আছে পূর্ণাঙ্গ গেজেটের।

বাবা রুস্তম আলী ক্ষোভ ও আক্ষেপ নিয়ে জানান, মেহেদী কোনো ধ্বংসাত্মক কাজ বা লুটপাটে যুক্ত ছিল না; মিছিলে থাকা অবস্থায় জীবন বাঁচাতে সে হোটেলে আশ্রয় নিয়েছিল।

বিপ্লবের এই কনিষ্ঠ বীর সেনানিকে অতি দ্রুত পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় ‘শহীদ’ মর্যাদা ও গেজেটভুক্ত করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন স্বজনসহ যশোরবাসী।

বিষয় :