Advertisement

ভোলার চরাঞ্চলে ৬ মাসে ৩০০ মহিষ চুরি

এশিয়া পোস্ট নিউজ, ভোলা
ভোলার চরাঞ্চলে ৬ মাসে ৩০০ মহিষ চুরি
ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীবেষ্টিত বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে মহিষ পালন। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীবেষ্টিত বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে বছরজুড়েই চলছে মহিষ চুরি ও ডাকাতির উপদ্রব। বিশেষ করে গভীর রাতে নদীপথে ট্রলার নিয়ে বাথানে হানা দিচ্ছে সংঘবদ্ধ চক্র। সম্প্রতি দৌলতখানের মদনপুর ইউনিয়নের বৈরাগীর চর থেকে এক রাতেই ২৫টি মহিষ চুরি হয়েছে। খামারিদের দাবি, গত ছয় মাসে জেলার বিভিন্ন চরাঞ্চল থেকে অন্তত ৩০০ মহিষ চুরি হয়েছে। নৌ-পুলিশের দাবি, জনবল ও নৌযান সংকটের কারণে দুর্গম চরাঞ্চলে নিয়মিত টহল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

Advertisement

স্থানীয় খামারিরা জানান, বছরের পর বছর ধরে বাথানভিত্তিক মহিষ পালন করে আসছেন তারা। তবে সম্প্রতি চরাঞ্চলে মহিষ চুরি ও ডাকাতির ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় খামারিদের নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে। নদীপথ ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ চক্র গভীর রাতে চরাঞ্চলে ঢুকে নির্জন বাথানগুলোকে টার্গেট করছে। মহিষ ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় বাধা দিতে গেলে অস্ত্র দেখিয়ে ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগীরা।

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

বৈরাগীর চরের বাথানমালিক কাশেম মাস্টার জানান, তিনি ১০ বছর ধরে লিজ নিয়ে সেখানে মহিষ পালন করছেন। আগে বছরে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা লিজ দিলেও এবার প্রায় ৭০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। ৫ আগস্টের আগে চুরির ঘটনা না ঘটলেও এরপর ৪-৫ বার তার গরু-মহিষ চুরি হয়েছে। বর্তমানে তার বাথানে প্রায় ৬৫০টি মহিষ রয়েছে, যার মধ্যে বিভিন্ন সময়ে ৩৫টি মহিষ চুরি হয়েছে। এর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় অর্ধকোটি টাকা। ৮-৯ জন রাখালের পেছনে মাসে প্রায় ২ লাখ টাকা খরচ হওয়ার পরও এভাবে চুরি বাড়তে থাকলে মহিষ পালন বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না বলে জানান তিনি। পুলিশ, নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ডকে জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি বলে অভিযোগ তার।

মহিষের মালিক আলাউদ্দিন সাজি বলেন, আগে বন্যা বা জোয়ার নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকলেও এখন মহিষ চুরির আতঙ্কে ঘুম হারাম হয়ে গেছে। জোয়ারের সময় অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে চোরেরা মহিষ নিয়ে যায়, প্রাণের ভয়ে রাখালরাও কিছু বলতে পারে না। তিনি চোর-ডাকাতের উপদ্রব কমাতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার টহল বাড়ানোর পাশাপাশি মহিষের জন্য নির্দিষ্ট চারণভূমি তৈরির দাবি জানান।

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

আরেক বাথানমালিক ইকবাল হোসেন রাজু বলেন, আমরা বংশানুক্রমে চরে মহিষ পালন করে আসছি, কিন্তু ৫ আগস্টের পর থেকে চরম আতঙ্কে আছি। চর থেকে কোনো ফোন আসলেই ভয়ে থাকি। মহিষের টক দই জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও খামারিদের নিরাপত্তায় বা আধুনিক বাথান তৈরিতে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। প্রশাসনকে বারবার জানিয়েও ফল মেলেনি। রাতে সরকারি টহল জোরদার করা হলে চুরি কমত।

খামারিদের দেওয়া তথ্যমতে, শুধু বৈরাগীর চর নয়, ভোলা সদর, দৌলতখান, বোরহানউদ্দিন, তজুমদ্দিন, লালমোহন, চরফ্যাশন ও মনপুরার দুর্গম চরাঞ্চল থেকেও গত ছয় মাসে অন্তত ২৫০ থেকে ৩০০টি মহিষ চুরি হয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানের সুযোগ নিয়ে চোরচক্র এক চর থেকে অন্য চরে পালিয়ে যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত টহল না থাকায় চোরেরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

এ বিষয়ে পূর্ব ইলিশা সদর নৌ-থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ আশিকুর রহমান জানান, প্রয়োজনের তুলনায় জনবল কম থাকার পাশাপাশি নৌযান ও পরিবহন সংকট রয়েছে। ফলে বিশাল নদী ও চরাঞ্চলে নিয়মিত টহল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

তবে কোস্টগার্ড দক্ষিণ জোনের স্টাফ অফিসার (অপারেশনস) লেফটেন্যান্ট কমান্ডার জামিলুর রহমান জানান, নৌপথে অপরাধ দমনে কোস্টগার্ড তৎপর রয়েছে এবং ইতোমধ্যে একাধিক চোরচক্রকে আটক করা হয়েছে। ভবিষ্যতে খামারিদের সঙ্গে আলোচনা করে মূল চক্রকে ধরতে দ্রুত অভিযান চালানো হবে।

ভোলা জেলা পুলিশ সুপার মো. শহিদুল্লাহ কাওছার জানান, মহিষ চুরি ঠেকাতে বাথানমালিকদের সমিতি গঠন, রাখালদের তথ্যভাণ্ডার তৈরি, সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা, লাঠি-বাঁশি সরবরাহ এবং জরুরি প্রয়োজনে ৯৯৯ নম্বরে কল দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরেজমিনে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

বিষয় :