logo
Advertisement

বগুড়া/দুই বছরেও হয়নি সেতু, ড্রামের ভেলায় ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার

দুই বছরেও হয়নি সেতু, ড্রামের ভেলায় ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার
বগুড়ার শিবগঞ্জে করতোয়া নদীর তীরে কাজ বন্ধ থাকা সেতু প্রকল্পের একাংশ। ছবি : এশিয়া পোস্ট

দুই বছর আগে শুরু হয়েছিল সেতুর নির্মাণকাজ। ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৮ কোটি টাকা। ৯৬ মিটার দীর্ঘ সেতুটি নির্মিত হলে করতোয়া নদী পারাপারে অবসান হওয়ার কথা ছিল দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের। কিন্তু দুই বছর পার হলেও চালু হয়নি সেতুটি। প্রকল্পের ভৌতিক অগ্রগতি মাত্র ৪৫ শতাংশ, আর আর্থিক অগ্রগতি ৩৮ শতাংশ।

ফলে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার কৃষ্ণপুর ও আলোকদিয়ারসহ আশপাশের অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষের নদী পারাপারের একমাত্র ভরসা এখন ড্রামের ভেলা। প্রতিদিন শিক্ষার্থী, কৃষক, নারী ও শিশুসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ ঝুঁকি নিয়ে এই ভেলায় করতোয়া নদী পার হচ্ছেন। নির্মাণকাজের এমন ধীরগতির পেছনে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতি আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

শুধু কাজ পিছিয়ে যাওয়াই নয়, নির্মাণস্থলে ফেলে রাখা সামগ্রীর অবস্থাও প্রশ্ন তুলেছে। সরেজমিনে দেখা যায়, সেতুর কাজ অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে এবং নির্মাণসামগ্রী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হয়েছে। বিভিন্ন লোহার সামগ্রীতে মরিচা ধরেছে, নষ্ট হচ্ছে পাথর ও ব্লকের অংশ। দীর্ঘদিন ধরে সরঞ্জাম এভাবে পড়ে থাকলেও তা সংরক্ষণ কিংবা দ্রুত কাজ শেষ করার দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই।

শিবগঞ্জ উপজেলার আলোকদিয়ার-কৃষ্ণপুর এলাকায় করতোয়া নদীর ওপর সেতু নির্মাণের দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। ‘বৃহত্তর পাবনা ও বগুড়া জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় ২০২৪ সালে প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৯৬ মিটার দীর্ঘ গার্ডার সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়।

প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদে কাজ শেষ না হওয়ায় ঠিকাদারের আবেদনের ভিত্তিতে সময় বাড়ানো হয়। কিন্তু বর্ধিত সময় পার হলেও কাজের অগ্রগতি অর্ধেকের নিচেই রয়ে গেছে। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও কাজ শেষ না হওয়ার দায় কার এবং এটি চূড়ান্তভাবে কবে নাগাদ শেষ হবে তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন এলাকাবাসী।

নদী পারাপারে স্থানীয়দের নিজস্ব উদ্যোগে তৈরি ড্রামের ভেলাই এখন ভরসা। ভেলা পারাপারের দড়িটুকুও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সরবরাহ করেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্ষায় নদীর পানি বাড়লে পারাপারের ঝুঁকি আরও বহুগুণ বেড়ে যায়।

স্থানীয় কৃষকেরা জানান, সেতুর কাজ শুরু হওয়ায় আশা ছিল উৎপাদিত ধান, সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য সহজে বাজারে নেওয়া যাবে। কিন্তু সেতু চালু না হওয়ায় পরিবহনসংকট রয়েই গেছে। বর্ষায় পানি বাড়লে কৃষিপণ্য পরিবহন আরও কঠিন হয়ে পড়ে; বাড়ে সময় ও খরচ, পচে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিকাদারকে সময় বাড়ানোর সুযোগ দেওয়া হলেও কাজ শেষ করাতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি কর্তৃপক্ষ। তাদের প্রশ্ন, প্রায় ৮ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ দুই বছরে যদি মাত্র ৪৫ শতাংশ হয়, তবে বাকি কাজ শেষ হতে আর কত সময় লাগবে? দীর্ঘদিন ধীরগতিতে চললেও তদারকিতে ঘাটতি রয়েছে বলেও দাবি তাদের।

সেতুটি সময়মতো না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মাঝে। প্রকল্প ঝুলিয়ে না রেখে ধীরগতির কারণ খতিয়ে দেখা, সরকারি সামগ্রী নষ্ট হওয়া বন্ধ করা ও অর্থ বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মতিন আকন্দ বলেন, সেতুর কাজ দ্রুত শেষ হবে আশা করে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করছি। কিন্তু কাজের গতি দেখে দুর্ভোগ কবে শেষ হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন জীবন ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হতে হচ্ছে।

শিক্ষার্থী সোহান বলে, প্রতিদিন স্কুলে যেতে ড্রামের ভেলায় নদী পার হতে হয়। বর্ষায় পানি বাড়লে ভয় আরও বাড়ে, একটু অসাবধান হলেই পানিতে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

মহাস্থান মাজার মসজিদ কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ও সমাজসেবক তাহেরুল ইসলাম বলেন, এলাকার প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার মানুষ নিয়মিত এই পথে চলাচল করেন। সেতুটি হলে কৃষক, শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের যোগাযোগ সহজ হতো। দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করে মানুষের দুর্ভোগ দূর করা প্রয়োজন।

ইউনিয়ন যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক ইমরান হোসেন বলেন, সেতুর কাজের ধীরগতির কারণ খতিয়ে দেখা দরকার। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতি থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। সরকারি অর্থের একটি প্রকল্প বছরের পর বছর এভাবে পড়ে থাকবে, তা মেনে নেওয়া যায় না।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘এমএস বসুন্ধরা কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড এমএস দোয়েল এন্টারপ্রাইজ’-এর ঠিকাদার শফিকুল ইসলাম। তার দাবি, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন কারণে নির্মাণকাজ ব্যাহত হয়েছে; ইচ্ছাকৃতভাবে কাজ ফেলে রাখা হয়নি। পানি কমলে আবার কাজ শুরু করা হবে। তবে দুই বছরের মধ্যে এক দফা পানি শুকিয়ে গেলেও কেন কাজ করা হয়নি—সেই প্রশ্নে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

সেতু নির্মাণকাজের গতি নিয়ে প্রকৌশলী শাহিদুল ইসলাম বলেন, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় ঠিকাদারের আবেদনে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল। বর্ধিত সময়ও শেষ হয়েছে। দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য ঠিকাদারকে তাগাদা দেওয়া হচ্ছে।

সামগ্রিক অগ্রগতি ও প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে এলজিইডিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদুজ্জামান বলেন, বোরিং করতে সমস্যা হয়েছিল। পূর্বের টিম বাতিল করে নতুন টিম আনা হয়েছে। পানি শুকালে আবার কাজ শুরু হবে। ঠিকাদারের কোনো গাফিলতি প্রমাণ হলে ২৮ দিনের নোটিশ দেওয়া হবে। এরপর পুনঃটেন্ডার করে নতুন করে কাজ শুরু করা হবে।