Advertisement

এক হাত নেই, তবুও কৃষকের দুঃখে সবার আগে ছুটে যান মফিজ

এশিয়া পোস্ট নিউজ, ঝিনাইদহ
এক হাত নেই, তবুও কৃষকের দুঃখে সবার আগে ছুটে যান মফিজ
শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে মাঠে-মাঠে কৃষি সেবা পৌঁছে দেন ঝিনাইদহ সদর উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মফিজ উদ্দিন। ছবি : সংগৃহীত

সরকারি চাকরিতে দায়িত্ব পালনে অনীহার অভিযোগ যখন প্রায়ই শোনা যায়, তখন শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে মাঠে মাঠে কৃষিসেবা পৌঁছে দিয়ে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ঝিনাইদহ সদর উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মফিজ উদ্দিন। কৃষকের সমস্যা যেন তার নিজের সমস্যা। জমিতে রোগ দেখা দিলে, ফসল ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হলে কিংবা আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্পর্কে জানার প্রয়োজন হলে কৃষকদের প্রথম ফোন যায় তার কাছেই।

Advertisement

সদর উপজেলার হলিধানী ব্লকে বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার ৫৫৩ জন কৃষক রয়েছেন। এসব কৃষকের কাছে সরকারি কৃষিসেবা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে রয়েছেন মফিজ উদ্দিন। তবে দায়িত্ব তার কাছে শুধু চাকরির অংশ নয়, এটি এক মানবিক অঙ্গীকার।

কৃষি কর্মকর্তা মফিজ উদ্দিন ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কালিচরণপুর ইউনিয়নের ছোট মান্দারবাড়িয়া গ্রামের মরহুম আফসার উদ্দিন জোয়ার্দারের ছেলে। সাত ভাই ও দুই বোনের বড় পরিবারে বেড়ে ওঠা মফিজ ছোটবেলা থেকেই সংগ্রামের সঙ্গে পরিচিত। বর্তমানে তিনি দুই কন্যাসন্তানের জনক। শিক্ষাজীবনে ঝিনাইদহ থেকে এসএসসি (ভোকেশনাল) পাস করার পর ফরিদপুর কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা ইন অ্যাগ্রিকালচার সম্পন্ন করেন। পরে যশোরের কাজী নজরুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজ থেকে ব্যাচেলর অব এডুকেশন (অ্যাগ্রিকালচার) ডিগ্রি অর্জন করেন।

তবে তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় শুরু হয় ২০০৯ সালের ১১ জানুয়ারি। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত অবস্থায় ট্রাকচাপায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তার ডান হাত। মুহূর্তেই বদলে যায় জীবন। কিন্তু হার মানেননি মফিজ উদ্দিন। দীর্ঘ চিকিৎসা, শারীরিক যন্ত্রণা এবং মানসিক সংগ্রামকে সঙ্গী করে নতুন করে জীবন গড়ার প্রত্যয় নেন। সীমাবদ্ধতাকে মেনে নেওয়ার পরিবর্তে সেটিকে জয় করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ধীরে ধীরে এক হাত দিয়েই জীবন ও কর্মক্ষেত্রের সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে শিখে নেন।

তার সেই অদম্য মনোবলের স্বীকৃতি মেলে ২০১৩ সালের ১৪ আগস্ট, যখন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন। কর্মজীবনের শুরু যশোরে। পরে বরিশাল ও ফরিদপুরে দায়িত্ব পালন শেষে ২০২২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহ সদর উপজেলার হলিধানী ব্লকে যোগদান করেন। এরপর মাঠমুখী কর্মকাণ্ড, কৃষকদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ এবং দ্রুত সমস্যার সমাধানের মাধ্যমে অল্প সময়েই কৃষকদের হৃদয়ে স্থান করে নেন।

এক হাতে মোটরসাইকেল চালিয়ে কৃষিসেবা পৌঁছে দেন মফিজ উদ্দিন। ছবি : এশিয়া পোস্ট কোলাজ
এক হাতে মোটরসাইকেল চালিয়ে কৃষিসেবা পৌঁছে দেন মফিজ উদ্দিন। ছবি : এশিয়া পোস্ট কোলাজ

স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, মফিজ উদ্দিনের প্রকৃত অফিস কোনো দালানকোঠা নয়; তার অফিস কৃষকের মাঠ। সরকারি ছুটির দিনেও কৃষকের ফোন পেলে তিনি ছুটে যান জমিতে। দিন-রাতের নির্দিষ্ট কোনো কর্মঘণ্টা নেই তার।

কৃষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ধানের জমিতে রোগ দেখা দিলে আগে খুব চিন্তায় পড়ে যেতাম। এখন মফিজ ভাইকে ফোন দিলেই চলে আসেন। জমিতে নেমে রোগ শনাক্ত করেন, কী ওষুধ দিতে হবে বলে দেন। এক হাত না থাকলেও কাজে তাকে কখনো দুর্বল মনে হয়নি।

কৃষক মো. আলামীন জানান, অনেক কর্মকর্তা অফিসে বসে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু মফিজ স্যারকে প্রতিদিন মাঠে দেখা যায়। তিনি আমাদের সমস্যাকে নিজের সমস্যা মনে করেন। তাই কৃষকরাও তাকে পরিবারের সদস্যের মতো ভালোবাসেন।

কৃষক শরিফুল ইসলাম জানান, এক হাতে মোটরসাইকেল চালিয়ে যেভাবে তিনি গ্রামে গ্রামে ঘোরেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর। তিনি শুধু কর্মকর্তা নন, আমাদের আপনজন।

কৃষি কর্মকর্তা মফিজ উদ্দিন বলেন, দুর্ঘটনার পর অনেকেই ভেবেছিলেন আমি হয়তো আর কিছু করতে পারব না। কিন্তু আমি বিশ্বাস করতাম, মানুষ চাইলে যেকোনো বাধা অতিক্রম করতে পারে। কৃষকদের জন্য কাজ করার ইচ্ছাটাই আমাকে শক্তি দিয়েছে। পুরস্কার বা সম্মাননা নয়, কোনো কৃষকের ক্ষতি কমলে, ভালো ফলন হলে কিংবা তার পরিবারে স্বস্তি ফিরলে সেটাই আমার সবচেয়ে বড় অর্জন।

এ বিষয়ে ঝিনাইদহ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নুর-এ-নবী এশিয়া পোস্টকে জানান, মফিজ উদ্দিন অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও পরিশ্রমী কর্মকর্তা। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তার কাজে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। তিনি কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক আস্থা অর্জন করেছেন।