logo

সব হারিয়েও হাল ছাড়েননি ৫৫ বছরের রুমিছা, ভ্যানের চাকায় ঘোরে সংসার

সব হারিয়েও হাল ছাড়েননি ৫৫ বছরের রুমিছা, ভ্যানের চাকায় ঘোরে সংসার

ভোর হতেই উনুনে হাঁড়ি বসান রুমিছা বেগম (৫৫)। দ্রুত রান্না শেষ করে পাঁচ বছরের নাতিকে খাইয়ে তৈরি হয়ে নেন। সকালের সূর্য ওঠার আগেই গ্যারেজ থেকে ভ্যানটি বের করেন তিনি। এরপর শুরু হয় জীবনের আরেক লড়াই। বাগেরহাট শহরের অলিগলি আর আশপাশের সড়কে সন্ধ্যা পর্যন্ত ভ্যান চালিয়ে যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনোমতে জোটে দুই পেটের আহার।

বাগেরহাট সদর উপজেলার উত্তর রাড়ীপাড়া গ্রামের এই সংগ্রামী নারীর জীবনের পরতে পরতে কেবলই বিচ্ছেদের গল্প আর বেঁচে থাকার লড়াই। ছোটবেলায় মা ও ২০০৪ সালে বাবাকে হারানোর পর থেকেই জীবনযুদ্ধে একা হয়ে পড়েন তিনি। মানুষের বাড়িতে কাজ থেকে শুরু করে বাড়ি বাড়ি ফেরি করা—কিছুই বাদ দেননি রুমিছা।

প্রথম স্বামী ক্যানসারে মারা যাওয়ার পর যখন দিশেহারা, তখন এক ব্যক্তির আশ্বাসে দ্বিতীয়বার ঘর বেঁধেছিলেন। কিন্তু নিয়তি সহায় হয়নি। বিয়ের পরপরই দ্বিতীয় স্বামী অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হন। তার চিকিৎসার খরচ জোগাতে ক্লিনিকে আয়ার কাজ নেন রুমিছা। মাসে তিন হাজার টাকা বেতনে যখন কুলাচ্ছিল না, তখন জমানো টাকা আর ঋণ নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ফেরি ব্যবসা শুরু করেন। মালামাল বহনের সুবিধার্থে নিজেই ধরেন ভ্যানের হ্যান্ডেল।

রুমিছার এই অদম্য লড়াইয়ের গল্প ২০২৪ সালে উঠে এসেছিল জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে। সঞ্চালক হানিফ সংকেতের আমন্ত্রণে সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে এক লাখ টাকা পুরস্কারও পান তিনি। জমানো টাকা আর পুরস্কারের অর্থ মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা খরচ করে স্বামীর বাড়ির পাশে ছোট একটি দোকান দিয়েছিলেন।

তবে ভাগ্য দেবীর কৃপা টেকেনি বেশিদিন। রুমিছার অভিযোগ, সুস্থ হওয়ার পর তার স্বামী অমানবিক আচরণ শুরু করেন। একপর্যায়ে মারধর করে জোরপূর্বক তালাকনামায় সই করিয়ে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়।

চোখের জল মুছে রুমিছা বেগম বলেন, যখন সে (স্বামী) অসুস্থ হইয়া পঙ্গুর মতো আছিল, তখন আমিই সব করছি। আজ সুস্থ হইয়া কয় আমাকে আর দরকার নাই। সব কাইড়া নিয়া রাস্তায় নামাইয়া দিছে।

বর্তমানে নিজের ভিটেমাটি না থাকায় ভাইয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। কিন্তু হাত গুটিয়ে বসে থাকার পাত্রী নন রুমিছা। আবারও ভ্যান নিয়ে নেমেছেন রাস্তায়। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে হাতে আসে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। এই সামান্য আয়েই বড় করছেন পাঁচ বছরের নাতিকে।

স্থানীয় ভ্যানচালক আব্দুল মালেক বলেন, একজন নারী হইয়া সকাল থেইক্যা সন্ধ্যা পর্যন্ত ভ্যান চালানো অনেক কষ্টের। ওনার লড়াই দেইখা আমাগোও মায়া লাগে।

এ বিষয়ে কচুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী হাসান বলেন, রুমিছা বেগমের সংগ্রামের কথা আমরা জেনেছি। বিষয়টি যাচাই করে সরকারিভাবে তাঁকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করার চেষ্টা করা হবে।