logo

বিদ্যুৎ সংকটেও ‘ভূতুড়ে’ বিলে নাকাল ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা

বিদ্যুৎ সংকটেও ‘ভূতুড়ে’ বিলে নাকাল ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা
ছবি : সংগৃহীত

তীব্র গরমের মধ্যে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে ঝিনাইদহের জনজীবন। বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল ব্যবসা ও ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও পড়ছে এর নেতিবাচক প্রভাব। এর সঙ্গে নতুন করে ভোগান্তি বাড়িয়েছে অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল। গ্রাহকদের অভিযোগ, আগের মাসগুলোর তুলনায় কোনো কোনো মাসে কয়েক গুণ বেশি বিল আসছে।

সদর উপজেলার হরিশংকরপুর গ্রামের বাসিন্দা নাসরিন বেগম বলেন, বাসায় আগের মতোই বিদ্যুৎ ব্যবহার করছি। কিন্তু কয়েক মাস ধরে বিলের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। মিটারের রিডিং ও বিলে উল্লেখ করা ইউনিট নিয়েও আমাদের যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

বিদ্যুৎ সংকটের কারণে চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরাও। তারা জানান, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় একদিকে যেমন কাজের সময় কমে আসছে, অন্যদিকে বিকল্প ব্যবস্থার কারণে পরিচালন ব্যয় বাড়ছে। বিশেষ করে ওয়েল্ডিং ও মেকানিক্যাল ওয়ার্কশপ, ছোট কারখানা, মিল, বেকারি ও প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসাগুলোতে এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে সবচেয়ে বেশি।

কালীগঞ্জ শহরের এক ওয়ার্কশপ মালিক সাইদুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ না থাকলে মেশিন চালানো যায় না, ফলে কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হয়। জরুরি কাজের প্রয়োজনে জেনারেটর চালাতে গিয়ে বাড়তি ডিজেল খরচ করতে হচ্ছে। এতে আমাদের উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। তার ওপর আবার গত মাসের তুলনায় এবার বিদ্যুৎ বিলও অনেক বেশি এসেছে।

এদিকে চলতি আমন মৌসুমে জমি প্রস্তুত ও ধান রোপণে ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলার কৃষকরা। এই সময়ে কৃষির সেচ কার্যক্রমেও বিদ্যুৎ সংকটের মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। সদর উপজেলার নলডাঙ্গা ইউনিয়নের কৃষক শামসুল ইসলাম বলেন, সেচের সময় বিদ্যুৎ না থাকলে জমিতে সময়মতো পানি দেওয়া যায় না। পরে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত টাকা খরচ করে বিকল্প উপায়ে সেচ দিতে হয়। এতে চাষাবাদের পুরো খরচই বেড়ে যাচ্ছে। সময়মতো জমি প্রস্তুত ও ধান রোপণ করতে না পারার আশঙ্কায় দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন বহু কৃষক।

বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি গ্রাহকদের সবচেয়ে বেশি ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অস্বচ্ছ ও নিয়ন্ত্রণহীন বিলিং ব্যবস্থা। একাধিক গ্রাহক অভিযোগ করেছেন, কোনো কোনো মাসে মিটারে থাকা আসল ব্যবহৃত ইউনিটের সঙ্গে কাগজের বিলে উল্লেখ করা হিসাবের কোনো মিল পাওয়া যাচ্ছে না।

তবে বিদ্যুৎ সরবরাহে লোডশেডিংয়ের বিষয়টি অস্বীকার করে ঝিনাইদহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) প্রকৌশলী মোহাম্মদ ওমর আলী দাবি করেন, ঝিনাইদহে বর্তমানে কোনো লোডশেডিং বা বিদ্যুতের ঘাটতি নেই। জাতীয় গ্রিড থেকে যতটুকু বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে, তার পুরোটাই গ্রাহকদের মধ্যে সুষ্ঠুভাবে বিতরণ করা হচ্ছে। লোডশেডিং অসহনীয় পর্যায়ে নেই।

পরিস্থিতির ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) ঝিনাইদহের নির্বাহী প্রকৌশলী দীন মোহাম্মদ মহিম বলেন, জেলায় বর্তমানে বিদ্যুতের মোট চাহিদা রয়েছে প্রায় ৪০ মেগাওয়াট। তবে এর বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৩০ মেগাওয়াট। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি থাকছে। এই ঘাটতি সামাল দিতে বাধ্য হয়েই রেশনিং পদ্ধতিতে বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় একসঙ্গে সব এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে এই সংকট সাময়িক এবং পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

একই প্রতিষ্ঠানের কালীগঞ্জ উপসহকারী আবাসিক প্রকৌশলী মিলন চন্দ্র সরকার বলেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহে কিছুটা ঘাটতি থাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।

ওজোপাডিকোর কালীগঞ্জ সাব-ডিভিশনের সাব-ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার জয়দীপ সরকার জানান, পাওয়ার গ্রিড থেকে ১০ থেকে ১২ মেগাওয়াট বরাদ্দ মেলায় লোড ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হচ্ছে। তবে কালীগঞ্জ পৌর এলাকার শ্রীরামপুরে একটি নতুন বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের (সাবস্টেশন) নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সেটি চালু হলে সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ কমবে এবং স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।

ভূতুড়ে বিলের বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মিটার রিডিং, পূর্বের বকেয়া বা সংযোগের ধরনভেদে মাসের বিলে কিছু তারতম্য হতে পারে। কোনো গ্রাহক অনিয়মের শিকার হয়েছেন মনে করলে অফিসে লিখিত অভিযোগ দিলে তা যাচাই করে দ্রুত সংশোধন করা হবে।