পিরোজপুরে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ, জনবল সংকটে ব্যাহত চিকিৎসাসেবা

পিরোজপুরে দিন দিন বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৫২ জন ডেঙ্গু রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গত নয় মাসে জেলার সাতটি উপজেলা ও সদর হাসপাতালে চার হাজারের বেশি রোগী ভর্তি হয়েছেন, যা বরিশাল বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে ১০০ শয্যার পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে চিকিৎসকসহ জনবলের ব্যাপক সংকট রয়েছে। ধারণক্ষমতার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকায় ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। এতে ভোগান্তিতে পড়ছেন পিরোজপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা রোগীরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বেশ কিছুদিন ধরে পিরোজপুরে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বরিশাল বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে। ১০০ শয্যার জেলা হাসপাতালে জায়গার সংকট থাকায় গাদাগাদি করে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে রোগীদের। রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় হাসপাতালের নতুন ২৫০ শয্যার ভবনের আংশিক কার্যক্রম চালু করে সেখানে জরুরি বিভাগ ও ডেঙ্গু কর্নার খোলা হয়েছে। এতে রোগীর চাপ কিছুটা কমলেও চিকিৎসক ও অন্যান্য জনবলের সংকটসহ নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।
পিরোজপুর জেলা হাসপাতাল শুধু জেলার বাসিন্দাদেরই নয়, আশপাশের বিভিন্ন এলাকার মানুষেরও চিকিৎসাসেবার অন্যতম ভরসা। জেলার প্রায় ২০ লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার কেন্দ্রবিন্দু এই হাসপাতাল। ফলে প্রতিদিনই এখানে বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৫২ জন ডেঙ্গু রোগী জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে ৮৬ জন, নাজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩৬ জন, নেছারাবাদে ১৮ জন, কাউখালীতে ১১ জন, ভান্ডারিয়ায় ২৫ জন, মঠবাড়িয়ায় ছয়জন ও জিয়ানগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঁচজন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সব মিলিয়ে জেলার হাসপাতালগুলোতে বর্তমানে ১৮৭ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে একজনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। অন্যদিকে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৩ হাজার ৮৬৪ জন।
তবে স্থানীয়ভাবে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও চার-পাঁচজনের মৃত্যুর কথা শোনা যাচ্ছে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্বাস্থ্য বিভাগ আরও জানায়, ১০০ শয্যার পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে একসঙ্গে প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ জন রোগী ভর্তি থাকেন। অথচ হাসপাতালটিতে অনুমোদিত ৬২টি চিকিৎসকের পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১৫ জন। কর্মচারীর ১৫২টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৩৭ জন। এ ছাড়া আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োজিত জনবল রয়েছে মাত্র ২১ জন।
হাসপাতালটিতে কিছু রোগনির্ণয় পরীক্ষা, সিজারিয়ান, অর্থোপেডিকস এবং নাক-কান-গলা বিভাগের অস্ত্রোপচার চালু রয়েছে। তবে জনবল সংকটের কারণে আলট্রাসনোগ্রাম সেবা বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ৩০০ রোগীর বিপরীতে খাবারের বরাদ্দ রয়েছে মাত্র ১০০ জনের।
জেলা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা নেছারাবাদ উপজেলার ভরতকাঠি গ্রামের বাসিন্দা চিরঞ্জীত মজুমদার বলেন, ছয় দিন ধরে তার আট বছর বয়সী ছেলে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে। জ্বর হওয়ার এক দিন পর পরীক্ষা করালে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। তবে এখনো তার অবস্থার উন্নতি হয়নি, বরং পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। তার তিন বছর বয়সী মেয়েও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে।
পিরোজপুর সদর উপজেলার ব্রাহ্মণকাঠী এলাকার মো. বেল্লাল শেখ বলেন, তার মা চার দিন ধরে জ্বরে ভুগছিলেন। পরে পরীক্ষা করালে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। এরপর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে।
সদরের নামাজপুর এলাকার বাসিন্দা মো. শাহারিয়ার বলেন, তার মা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে প্রায় আট দিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তার অভিযোগ, চিকিৎসকেরা নিয়মিত রোগীদের কাছে আসেন না। নার্সদের কিছু বললেও তারা গুরুত্ব দেন না। এমনকি ক্যানোলা পরিবর্তন করে দেওয়ার অনুরোধ করলেও তা করা হয় না।
সদর উপজেলার খানাখুনিয়ারী গ্রামের বাসিন্দা লাইলী বেগমও চিকিৎসাসেবা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, চিকিৎসকেরা রোগীদের তেমন গুরুত্ব দেন না। কথা বললেও অনেক সময় শুনেও না শোনার ভান করেন। তার শরীরে প্রচণ্ড জ্বর, মুখে ঘা এবং বমির সমস্যা হচ্ছে।
সদরের শিকদার মল্লিক ইউনিয়নের বাসিন্দা সবুজ মজুমদার জানান, তার বোন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। প্রতিদিন তার সিবিসি (কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট) পরীক্ষা করাতে হয়। কিন্তু পরীক্ষার রিপোর্ট পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, সকাল ৯টায় প্যাথলজি বিভাগ খোলার পর তিনি সিবিসি পরীক্ষার টিকিট কাটেন। পরে রিপোর্ট আনতে গেলে তাকে পরদিন আসতে বলা হয়। একটি সিবিসি পরীক্ষার রিপোর্ট পেতে সাধারণত ৪০ থেকে ৪৫ মিনিট লাগার কথা থাকলেও তার বোনের রিপোর্ট পেতে প্রায় ছয় ঘণ্টা লেগেছে। এ সময়ের মধ্যে তিনি ছয়-সাতবার রিপোর্টের খোঁজ নিতে গেছেন।
সবুজ মজুমদার আরও বলেন, গুরুতর অসুস্থ রোগীর পরীক্ষার রিপোর্ট পেতে এত সময় লাগলে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে পারে। তা ছাড়া দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক রিপোর্ট পাওয়ার আগেই ডিউটি শেষ করে চলে যান। পরে জরুরি বিভাগের চিকিৎসককে রিপোর্ট দেখাতে হয়। কিন্তু ওই চিকিৎসকের কাছে রোগীর আগের অবস্থা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য নাও থাকতে পারে। এতে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়।
পিরোজপুর জেলা হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ইসিতা সাদক বলেন, পিরোজপুরে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা কমছে না; বরং দিন দিন পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবাইকে সচেতন হতে হবে। বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং মশারি টাঙিয়ে ঘুমানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, চিকিৎসক, নার্সসহ হাসপাতালের সব পর্যায়েই জনবল সংকট রয়েছে। তারপরও তারা সাধ্য অনুযায়ী রোগীদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. নিজাম উদ্দিন বলেন, হাসপাতালের ধারণক্ষমতার তুলনায় তিন গুণেরও বেশি রোগী ভর্তি থাকেন। ফলে সব রোগীকে সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয়। নতুন ভবনের কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। কর্তৃপক্ষ ভবনটি হস্তান্তর করলে সেখানে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।
পিরোজপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মতিউর রহমান বলেন, জেলায় ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন, তথ্য অধিদপ্তর, পৌরসভা ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে সচেতনতামূলক সভা করা হচ্ছে। পাশাপাশি জেলার হাসপাতালগুলোতে রোগীদের স্বাস্থ্যশিক্ষা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে এবং প্রতি সপ্তাহে হাসপাতালের আশপাশে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
জনবল সংকটের বিষয়ে সিভিল সার্জন বলেন, জেলা হাসপাতালে বেশ কিছু চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর পদ শূন্য রয়েছে। এ কারণে কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যা হচ্ছে। তারপরও রোগীদের সেবা নিশ্চিত করতে সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা চলছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। শিগগিরই জনবল সংকট পূরণ হবে বলে আশা করছেন তারা।

