মহিষ প্রজননের একমাত্র খামারে নেই ভেটেরিনারি সার্জন

মহিষ প্রজনন করার জন্য দেশে সরকারিভাবে পরিচালিত একমাত্র খামারটিতে নেই ভেটেরিনারি সার্জন। প্রতিষ্ঠার প্রায় ৩৮ বছরেও খামারটির জন্য ভেটেরিনারি সার্জন পদ সৃষ্টি করা হয়নি। এ ছাড়াও অনুমোদিত বিভিন্ন পর্যায়ের ৫২টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১০ জন। অর্থাৎ ৪২টি শূন্য রয়েছে। সীমিত জনবল দিয়ে চলছে খামারের কার্যক্রম।
বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার পিলজংগ এলাকায় ১৯৮৪-৮৫ সালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত হয় মহিষ প্রজনন ও উন্নয়ন খামারটি। ৯৫ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এ খামারে বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২৮০টি মহিষ রয়েছে। উন্নত জাতের মহিষের প্রজনন, বাছুর উৎপাদন ও বিতরণের মাধ্যমে দেশের মহিষ খাতের উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে প্রতষ্ঠানটি।
প্রতিষ্ঠার সময় দুইজন কর্মকর্তা ও ৪৮ জন কর্মচারীসহ মোট ৫০ জন জনবল নিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়। তখন খামারে ছিল ১১১টি মহিষ। সময়ের সঙ্গে মহিষের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ২৮০টিতে দাঁড়ালেও সে অনুযায়ী বাড়েনি জনবল।
খামার সূত্রে জানা গেছে, রাজস্ব খাতে অনুমোদিত ৫২টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১০ কর্মকর্তা-কর্মচারী। বদলি, অবসরসহ নানা কারণে দীর্ঘ দিন ধরে ৪২টি পদ শূন্য পড়ে আছে। সম্প্রতি আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় ২২ জন কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাদের যুক্ত করে কোনোমতে খামারের দৈনন্দিন কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
প্রায় ২৮০টি মহিষের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা, প্রজনন কার্যক্রম এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ভেটেরিনারি চিকিৎসক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রতিষ্ঠার প্রায় ৩৮ বছর পেরিয়ে গেলেও খামারে ভেটেরিনারি সার্জনের কোনো পদ সৃষ্টি হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্থায়ী ভেটেরিনারি চিকিৎসক না থাকায় মহিষের স্বাস্থ্যসেবা ও প্রজনন কার্যক্রম পরিচালনায় নানা ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজনে বাইরের চিকিৎসকের ওপর নির্ভর করতে হয়।

বর্তমানে খামারে প্রায় ২৮০টি মহিষ রয়েছে। এর মধ্যে ৪৪টি মহিষ নিয়মিত দুধ দিচ্ছে। এসব মহিষ থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩০ লিটার দুধ উৎপাদন হয়।
খামারে উৎপাদিত দুধের স্থানীয়ভাবে রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত খামার থেকেই সরাসরি ভোক্তাদের কাছে দুধ বিক্রি করা হয়। প্রতি কেজি দুধের দাম ৭০ টাকা। প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ জন মানুষ খামারে এসে দুধ সংগ্রহ করেন।
মহিষের সংখ্যা, বয়স ও শারীরিক প্রয়োজন বিবেচনায় প্রতিদিন দানাদার খাবারের মিশ্রণ প্রস্তুত করা হয়। বর্তমানে প্রায় ২৮০টি মহিষের জন্য প্রতিদিন গড়ে ৭০০ কেজি দানাদার খাবারের মিক্সচার তৈরি করতে হয়। মহিষের সংখ্যা ও বয়সের পরিবর্তনের সঙ্গে খাবারের পরিমাণও কম-বেশি হয়।
খামারটির মূল উদ্দেশ্য শুধু দুধ উৎপাদন নয়; উন্নত জাতের মহিষের প্রজনন, বংশ বিস্তার এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় এর সম্প্রসারণ। এ লক্ষ্যে খামার থেকে উৎপাদিত বাছুর খামারিদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
খামার সূত্র জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১০১ জন খামারির মধ্যে ১৪১টি মহিষের বাছুর বিতরণ করা হয়েছে। উন্নত জাতের মহিষ ছড়িয়ে দিয়ে দেশে মহিষ পালন বাড়ানো এবং খামারিদের উৎসাহিত করাই এ কার্যক্রমের অন্যতম লক্ষ্য।

২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর সকালে মাঠে ঘাস খাওয়ার পর হঠাৎ কয়েকটি মহিষ ছটফট করতে শুরু করে। কিছুক্ষণ পর একে একে ২০টি মহিষ মারা যায়। খামার কর্তৃপক্ষের হিসাবে, বিষক্রিয়ায় মারা যাওয়া এসব মহিষের আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ৫০ লাখ টাকা।
একসঙ্গে এতগুলো মহিষের মৃত্যুর ঘটনায় খামারে স্থায়ী ভেটেরিনারি চিকিৎসক না থাকার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। জরুরি মুহূর্তে দ্রুত ও কার্যকর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে আসে।
জনবল ও ভেটেরিনারি চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি খামারটিতে রয়েছে বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোগত নানা সমস্যা। বিদ্যুৎ সরবরাহ সবসময় স্বাভাবিক না থাকায় খামারের নিয়মিত কার্যক্রম ব্যাহত হয়। সার্বক্ষণিক কার্যক্রম সচল রাখতে একটি জেনারেটর প্রয়োজন বলে জানিয়েছে খামার কর্তৃপক্ষ।
এ ছাড়া খামারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাউন্ডারি ওয়াল উঁচু করা, নিচু ও ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সংস্কার এবং প্রয়োজনীয় স্থানে মাটি ভরাট করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের মহিষের জাত উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এ প্রতিষ্ঠানের আরও বড় পরিসরে কাজ করার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সেজন্য শূন্য পদগুলোতে দ্রুত জনবল নিয়োগ, ভেটেরিনারি সার্জনের পদ সৃষ্টি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এসব সমস্যা সমাধান করা গেলে খামারের দুধ উৎপাদন, উন্নত জাতের মহিষের প্রজনন ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে মহিষ প্রজনন ও উন্নয়ন খামারের সিনিয়র সহকারী পরিচালক শেখ আল মামুন এশিয়া পোস্টকে বলেন, খামারের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য জরুরি ভিত্তিতে একজন ভেটেরিনারি সার্জন প্রয়োজন। অনুমোদিত ৫২টি পদের মধ্যে ৪২টি শূন্য রয়েছে। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ২২ জন কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হলেও সীমিত জনবল দিয়ে কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যা সমাধানে একটি জেনারেটর প্রয়োজন। পাশাপাশি বাউন্ডারি ওয়াল সংস্কার ও উঁচু করা এবং প্রয়োজনীয় স্থানে মাটি ভরাট জরুরি।
শেখ আল মামুন আরও বলেন, বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৭০০ কেজি দানাদার খাবার প্রস্তুত করা হয়। খামারের কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে প্রয়োজনীয় জনবল, ভেটেরিনারি চিকিৎসাসেবা ও অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করা দরকার।



