অপহরণের পর হত্যা, আলামত নষ্ট করতে লাশ ইটভাটায় পোড়ানোর অভিযোগ

নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলায় ইটভাটা ব্যবসায়ী জাবেদ হোসেন (৩৫) নিখোঁজ হওয়ার এক বছরেরও বেশি সময় পার হলেও এখনও তার কোনো সন্ধান মেলেনি। পরিবারের দাবি, তাকে পরিকল্পিতভাবে অপহরণ করে হত্যা করা হয়েছে এবং প্রমাণ নষ্ট করতে লাশ ইটভাটায় পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় এখনও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না থাকায় পুরো ঘটনাটি ঘিরে রহস্য ও উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১৩ মার্চ বিকেলে ব্যবসায়িক আলোচনার কথা বলে জাবেদ হোসেনকে বাড়ি থেকে ডেকে নেওয়া হয়। এরপর থেকে তিনি আর বাড়ি ফেরেননি। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়, যা নিখোঁজের ঘটনাকে আরও রহস্যময় করে তোলে।
স্থানীয় পর্যায়ে খোঁজাখুঁজির পরও তার কোনো সন্ধান না পাওয়ায় পরিবারের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়। প্রথমদিকে বিষয়টি নিখোঁজ হিসেবে দেখা হলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অপহরণ ও হত্যার আশঙ্কা জোরালো হতে থাকে।
নোয়াখালী অঞ্চলে ইটভাটা, জমি দখল ও মাটি কাটাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে এমন তথ্য বিভিন্ন অনলাইন সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এসব ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই চলে, যেখানে চাঁদাবাজি, হুমকি ও হামলার মতো ঘটনা প্রায় ঘটে।
চাটখিল ও আশপাশের এলাকাতেও অতীতে ইটভাটা দখল ও ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে একাধিক সংঘর্ষের খবর প্রকাশিত হয়েছে। ফলে জাবেদ হোসেনের নিখোঁজের ঘটনাকেও অনেকে একই প্রেক্ষাপটে দেখছেন।
ভুক্তভোগী পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, নিখোঁজের পরদিনই স্থানীয়ভাবে খবর ছড়ায় জাবেদকে গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। পরে তার লাশ নাহারখিল এলাকার একটি ইটভাটায় নিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়, যাতে কোনো প্রমাণ না থাকে।
যদিও এ দাবির পক্ষে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি। তবে স্থানীয় একাধিক সূত্রে একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে পরিবার দাবি করছে। এতে ঘটনাটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নোয়াখালীর বিভিন্ন এলাকায় অতীতে হত্যার পর লাশ গুম বা পুড়িয়ে ফেলার অভিযোগ উঠেছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মাধ্যমে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার অভিযোগ নতুন নয়।
একই সঙ্গে চাঁদাবাজি ও গুলিবর্ষণের ঘটনাও অতীতে একাধিকবার আলোচনায় এসেছে, যা ইঙ্গিত দেয় এ ধরনের সংঘবদ্ধ অপরাধের একটি ধারাবাহিকতা রয়েছে।
নিখোঁজের পর পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় যোগাযোগ করা হলেও শুরুতে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি এমন অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে আদালতে মামলা দায়েরের পর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এখনও কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়নি এবং নিখোঁজ জাবেদের লাশ বা ঘটনার আলামতও উদ্ধার করা যায়নি। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
স্থানীয়দের দাবি, অভিযুক্তদের একটি অংশ এলাকায় প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না। ফলে প্রত্যক্ষদর্শী বা সাক্ষীর অভাবে তদন্ত কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পর থেকে তারা বিভিন্নভাবে হুমকির মুখে রয়েছেন।
নিখোঁজ জাবেদ হোসেনের পরিবার বর্তমানে চরম অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। তার স্ত্রী তিন সন্তানকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন বলে জানা গেছে। হুমকির কারণে তারা স্বাভাবিকভাবে বসবাস করতে পারছেন না এবং বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
ভুক্তভোগী পরিবার এই ঘটনায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। তারা র্যাব বা পিবিআইয়ের মাধ্যমে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়।
এই বিষয়ে বুধবার (২২ এপ্রিল) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে নিখোঁজের স্ত্রী শারমিন আক্তার রূপা জানান, অপহরণের পর আমার স্বামী জাবেদ হোসেনকে ইটভাটায় পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে জানতে পেরেছি। হত্যা করেছে খুনি রাশেদ আর আশরাফ, আমি এই ঘটনার বিচার চাই।
তিনি বলেন, ছেলেমেয়েকে নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছি। এই ঘটনার বিচার চাইতে গেলে খুনিরা আমাকে ও আমার সন্তানদের হত্যা করবে বলেও হুমকি দিচ্ছে। আমি এসব বিষয়ে সরকার ও প্রশাসনের কাছে বিচারের দাবি জানাই। মানবিকভাবে হলেও এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য সরকারের কাছে সহযোগিতা কামনা করছি।